শুক্রবার, ৩ জুন, ২০১১

বৌদ্ধ মতবাদ

বৌদ্ধ মতবাদ বলতে যে সব বাজারে চলতি বই রয়েছে তাতে বৌদ্ধত্বের চেয়ে হিন্দুত্বের প্রভাব প্রবল। যে বুদ্ধ নিরীশ্বরবাদী, কার্যকারণ সম্পর্কে বিশ্বাসী- সেই বুদ্ধকে দেবতা বানিয়ে ছাড়তে কেউই প্রায় কসুর করেননি। বুদ্ধকে ঘিরে কাহিনী ও তথাকথিত ইতিহাসে অলৌকিক ঘটনার ছড়াছড়ি। পালি ভাষায় বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে প্রথম লেখা হয় তাও বুদ্ধের মৃত্যুর কয়েক'শ বছর পরে। তখন আদি বৌদ্ধ ধর্মের রূপান্তর ও বিভাজন হয়েছে। পালি বৌদ্ধশাস্ত্রে আমরা পেলাম পল্লবিত, অলৌকিকে ভরা বুদ্ধকে।


সিদ্ধার্থ গৌতমের জন্মও আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫৬৩ নাগাদ। পিতা শুদ্ধোধন ছিলেন শাক্য উপজাতি গোষ্ঠীর প্রজাতন্ত্রের পার্লামেন্ট বা গণসংস্থার সদস্য। এই সময় ভারতবর্ষে আরো কিছু গণরাজ্য বা প্রজাতন্ত্র ছিল। এইসব গণরাজ্যের, গণসংস্থার সদস্যকে রাজা বলা হত। বুদ্ধ সাহিত্য বিনয়পিটক, বুদ্ধচর্যা, মজ্ঝিমণিকা ইত্যাদি থেকে আমরা জানতে পারছি শাক্য প্রজাতন্ত্রে শুদ্ধধন ছা'ড়াও রাজা ছিলেন ভিদ্দিয় এবং দণ্ডপাণি।


গৌতমের মা মায়াদেবী পিত্রালয়ে যাবার পথে কপিলাবস্তুর কাছে লুম্বিনীতে গৌতমের জন্মও দেন। লুম্বিনীর বর্তমান নাম রুম্মিন্দেই, নেপাল-তরাই অঞ্চলের নৌতনবা স্টেশন থেকে আট মেইল পশ্চিমে। গৌতমের জন্মের সাত দিনের মধ্যে মায়াদেবীর মৃত্যু হয়। মাসি তথা বিমাতা গৌতমী শিশুটিকে পালনের দায়িত্ব নেন। গৌতমী-পালিত পুত্রের নাম হয় গৌতম। যৌবনে গৌতমের বিয়ে হয়। প্রতিবেশী কোলিয় গণরাজের কন্যা যষোধরা। পুত্র রাহুলের জন্ম হয়। গৌতম ঐশ্বর্যের মধ্যেই বড় হয়েছিলেন। সাধারণের দুঃখ-দারিদ্রের কষ্ট তার অজানা ছিল। বার্ধক্য, রোগ ও মৃত্যু দেখে তিনি মানসিকভাবে আঘাত পান। এই দুঃখময় জীবন থেকে পরিত্রাণের উপায় খূঁজতে সংসার ছেড়ে পথে বেড়িয়ে পরেন।


পরিব্রাজক গৌতম প্রথমে যান আলার কালাম এর কাছে। সেখানে কিছু যোগাভ্যাস শেখেন। তাতে মন পরিতৃপ্ত হল না। এরপর যান রামপুত্তের কাছে। সেখানেও কিছু যোগবিদ্যা শেখেন। এরপর তিনি বোধগয়ার কাছে ছয় পবছর যোগ-সাধনা। দীর্ঘ সময় ধরে অনশনে থেকে যোগ-সাধনা করেন। তাতে পরিতৃপ্তি এল না। বোধ বা জ্ঞান এল না। এল অনশনের কারণে কৃশতা ও দুর্বলতা। এই সময় সুজাতা নামের এক গোপকন্যার সঙ্গে গৌতমের পরিচয় হয়। সুজাতা বলেন, এমন দুর্বল শরীরে চিত্তের একাগ্রতা আনা বা সমাধি আনা অসম্ভব। শরীরকে সুস্থ রাখতে খাদ্যগ্রহণ প্রয়োজন। সুজাতা ছিলেন উন্নতমনা। তাঁর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা গৌতমের পূর্ব-ধারণা পরিবর্তিত হয়। গৌতম 'বুদ্ধ' হবার পর নারীদেরকেও দীক্ষা দিয়ে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। ধনী মহিলা বিশাখা যেমন বুদ্ধের গৃহীশিষ্যা ছিলেন, তেমন বিমাতা গৌতমীও সঙ্ঘের সদস্যা হন।


যাই হোক, সুজাতার যুক্তি মেনে গৌতম খাবার গ্রহণ করলেন। এতে গৌতমের পাঁচ সাধনসঙ্গী গৌতম আদর্শচ্যুত হয়েছেন মনে করে তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করেন।


একটু সবল হয়ে গৌতম নিরঞ্জনা নদীর তীরে এক বটগাছের তলায় বসে গভীর চিন্তায় মগ্ন হলেন। জীবন ও জগৎ রহস্য নিয়ে তিনি নতুন বোধ বা উপলব্ধিতে পৌঁছলেন। নিজের দুঃখময় জীবন থেকে নির্বান লাভ করে বুদ্ধ হলেন। আত্মনিগ্রহ থেকে বিচ্যুত দেখে যে পাঁচ সঙ্গী বুদ্ধের সং ত্যাগ করেছিল, তাঁদের সন্ধানে তিনি সারনাথে গেলেন। সেখানে সঙ্গীদের পেলেন। তাঁদের সামনে নিজের নতুন পাওয়া 'বোধ' বিষয়ে বক্তব্য রাখলেন। এই বক্তব্য বা ভাষণ বৌদ্ধ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কাছে 'ধর্মচক্র-প্রবর্তন' হিসেবে খ্যাত। অই পাঁচ শিষ্যকে নিয়ে বৌদ্ধ দঙ্ঘের সূচনা। ধর্মচক্র প্রবর্তনের চার মাসের মধ্যে বুদ্ধের সীক্ষিত সন্ন্যাসীর সংখ্যা দাঁড়ায় ষাটে। এরপর বুদ্ধ আরো চুয়াল্লিশ বছর বেঁচে ছিলেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের নানা অঞ্চলে ঘুরেছেন। অধিবাসীদের উপদেশ দিয়েছেন। এইসব উপদেশে ভক্তির চেয়ে যুক্তি-বুদ্ধির দিকে জোর দিয়েছিলেন বেশি।


আশি বছর বয়সে কুশীনারা বা কুশীনগরে (বর্তমান কসয়া, গোরখপুর জেলা) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বুদ্ধের জীবনী জানতে পড়তে পারেন- বুদ্ধচরিত, ললিতবিস্তর, মহাবস্তু, বিনয়কথা,নিদানকথা,বিনয়পিটক,মজ্ঝিমণিকা,মহাপাদন-সুত্ত,মহানির্বান-সুত্ত,সুত্তনিপাত ইত্যাদি। আরো পড়তে পারেন নরেন্দ্রনাথ ভাট্টাচার্যের বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস, রাহুল সাংকৃত্যাওনের বৌদ্ধ দর্শন।


বুদ্ধের চার সিদ্ধান্ত :

বুদ্ধের উপদেশাবলী বুঝতে হলে বুদ্ধের মূল চার সিদ্ধান্ত জানাটা খুবই জরুরু। সিদ্ধান্তগুলো হল :

১. ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার না করা।

২. আত্মাকে 'নিত্য' স্বীকার না করা।

৩. কোন গ্রন্থকে স্বতঃপ্রমাণ হিসেবে স্বীকার না করা।

৪. জীবন প্রবাহকে স্বীকার করা।


১. ঈশ্বরের অস্তিত্বে সীকার না করা :

জগতের স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে ঈশ্বরের অস্তিত্ব বুদ্ধ অস্বীকার করেছিলেন। তাঁর মতে- 'জগতের সৃষ্টি হয়েছে প্রাকৃতিক নিয়মে। জগৎ নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে প্রকৃতি জগতের স্বাভাবিক নিয়ম দ্বারা।' কেউ কেউ মনে করেন, ঈশ্বর জগতের স্রষ্টা, যেমন কুম্ভকার মৃতপাত্রের স্রষ্টা। ঈশ্বর সর্বব্যাপী। ঈশ্বর স্রষ্টা হলে তিনি কুম্ভকারের মত মাটি ও মৃতপাত্র হতে পৃথক। ঈশ্বর যদি তাঁর সৃষ্টি থেকে পৃথক হন, তবে তিনি সর্বব্যাপ্ত হতে পারেন না।


ঈশ্বর যদি সর্বশক্তিমান হন, তাঁর ইচ্ছাতেই যদি মানুষের কাজ-কর্ম নির্ধারিত হয়, তবে অসট কাজের জন্য মানুষ কেন দায়ী হবে?


মনুষ্য জগতের বাইরের অন্যান্য প্রাণী, যাদের ভাল-মন্দ বিচার-বোধ নেই, তাদের কাজ-কর্মের জন্য ঈশ্বর কীভাবে তাদের দায়ী করবে?


পৃথিবীতে সুখের চেয়ে দুঃখের পরিমাণ বেশি। তবে কি ঈশ্বর যতটা দয়ালু, তারচেয়ে বেশি নিষ্ঠুর?


সমস্ত ঘটনার পিছনে কার্য-কারণ থাকে। বুদ্ধের এই সর্বব্যাপী কার্য-কারণ তত্ব 'প্রতীত্যসমুৎপাদবাদ' নামে পরিচিত। কার্য-কারণ সম্পর্ক ছাড়া মানসিক জগতের বা বাইরের জগতের কোন কিছু ঘটা সম্ভব নয়। আমাদের জীবনে যে দুঃখের 'প্রতীত্য' বা প্রাপ্তি ঘটে তার পেছনেও আছে 'সমুৎপাদ' বা উৎপত্তির কারণ। কারণ দুটি। ১. তৃষ্ণা ও ২. অবিদ্যা। ইন্দ্রিয়সুখের প্রতিটি তৃষ্ণাই মানুষ্কে লোভী, নিষ্ঠুর ও হত্যাকারী করে তোলে। দুঃখ যেমন আছে, দুঃখ নিবারণের উপায়ও তেমনি আছে। দুঃখ বিনাশের পথ হিসেবে বুদ্ধ অষ্টাঙ্গিক মার্গের উপদেশ দিয়েছেন।


মানুষের জীবনে দুঃখ অনিবার্য, বুদ্ধের এই মতবাদ দুঃখবাদ নামে পরিচিত। অবিদ্যাকে দুঃখবাদের একটি কারণ বলে বুদ্ধ উল্লেখ করেছেন, এ'কথা আমরা আগেই জেনেছি। অবিদ্যা বলতে তিনি বলেছেন সঠিক জ্ঞানের অভাব বা সম্যক জ্ঞানের অভাব, সত্য সম্বন্ধে অজ্ঞানতা, স্রেষ্ঠ-সত্য না জানা। আমাদের জানতে হবে, চার মহাভূত পৃথিবী, জল, বায়ু, অগ্নি থেকেই জগতের সবের সৃষ্টি, ধ্বংসে সবই এই চারে বিলীন হয়। ইন্দ্রিয় সম্পর্কিত বিজ্ঞানকে জানতে হবে। ছয় ইন্দ্রিয় হল- চক্ষু, শ্রবণ, ঘ্রাণ, জিহ্বা, ত্বক ও মন। বিজ্ঞান হল চেতনা বা মনেরই নাম। বুদ্ধের কথায়, 'আমাদের যাবতীয় দুঃখের কারণ তৃষ্ণা ও অবিদ্যা। দুঃখ ঈশ্বরের রুষ্টতা থেকে আসে না। ঈশ্বর মানুষের মনোজগতের কল্পনা।'



২. আত্মাকে নিত্য স্বীকার না করা :

বৌদ্ধযুগে বেদ-বিশ্বাসী ব্রাহ্মণ ও পরিব্রাজকেরা মনে করতেন, আত্মা এক নিত্য ও চেতন শক্তি। অর্থাৎ আত্মা অমর, যার ক্ষয় নেই, যার জন্ম নেই, মৃত্যু নেই, যাকে অস্ত্র দ্বারা কাটা যায় না, আগুনে পোড়ানো যায় না। এই নিত্য চেতন শক্তি শরীর থেকে পৃথক। কোন দেহে চেতনা বা আত্মা থাকলে সে তখন জীবিত। দেহ থেকে চলে গেলে মৃত। এই সময় কিছু উন্নত চিন্তার এগিয়ে থাকা মানুষ জানালেন- আত্মা শরীরেরই গুণ, শরীর থেকে পৃথক কোন শক্তি নয়। শরীরে নির্দিষ্ট পরিমাণে ভূত-পদার্থের (মৌল পদার্থের) মিশ্রণের রাসায়নিক বক্রিয়ার ফলে শরীরে উষ্ণতা, উদ্যম ও চেতনা সৃষ্টি হয়। ভূত পদার্থের তারতম্য ঘটলে আবার তা হারিয়ে যায়। বুদ্ধ আত্মাকে 'অনিত্য' বললেন। তবে তাঁর এই 'অনিত্য' শব্দার্থ তাঁর সমসাময়িক চিন্তাবিদদের 'অনিত্য' শব্দার্থের চেয়ে কিছু আলাদা।


বুদ্ধ আত্মার সংজ্ঞা দিলেন- 'চিত্ত-বিজ্ঞান' বা 'মনো-বিজ্ঞান' আর 'আত্মা' একই বস্তু। আমরা যেভাবে চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, ত্বক ও জিহ্বা এই পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে প্রত্যক্ষ করতে পারি, মনকে সে'ভাবে পারি না। চোখ হয়তো লোভনীয় খাদ্যবস্তু দেখতে পেল। নাক তার গন্ধ এনে দিল। জিহ্বা ইন্দ্রিয় ভোগ তৃষ্ণা অনুভব করল। জিভে জল চলে এল। এই যে চোখ, নাক ও জিভ এই তিন ইন্দ্রিয়কে মেলাবার ভূমিকা যে পালন করল সেও ইন্দ্রিয়। বিভিন্ন ইন্দ্রিয়কে চালনাকারী ইন্দ্রিয়ের নাম 'মন'। এই মন বা চিত্তই আত্মা, ( মনোবিজ্ঞান অবশ্য ;মন'কে ইন্দ্রিয় বলে স্বীকার করে না।)


বুদ্ধের মতে- 'সবকিছুই অনিত্য, ক্ষণস্থায়ী। ' বুদ্ধের এই সর্বব্যাপী পরিবর্তন, বিবর্তন, অনিত্য তত্বই 'ক্ষণিকবাদ' নামে পরিচিত। ক্ষণিকবাদ অনুসারে জগৎ নিয়ত পরিবর্তনশীল। যার শুরু আছে, তার শেষ আছে। যার জন্ম আছে, তার মৃত্যু আছে। জাগতিক বস্তু, প্রাকৃতিক বস্তু ও মানসিক চিন্তা-ভাবনা সবই নিরন্তন পরিবর্তিত হচ্ছে। বুদ্ধের কথায় এই পরিবর্তনই একমাত্র সৎ, শাশ্বত, সনাতন।


যে প্রদীপ শিখাকে আমরা জ্বলন্ত দেখি, সেই শিখার কিছুক্ষণ আগে দেখা আগুন ও কিছুক্ষণ পরে দেখা আগুন এক নয়। প্রতিটি মুহূর্তে জ্বলছে নতুন আগুন। যতক্ষণ প্রদীপে তেল ও পলতে থাকবে ততক্ষণ আগুন জ্বলবে। প্রতিটি মুহূর্তের ভিন্ন ভিন্ন আগুনের শিখাকে প্রতিটি মুহূর্তে আমরা দেখছি এবং ভাবছি- একই আগুন।


আমাদের শরীর প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত হচ্ছে। পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে আসা একটি মানুষের কথা ভাবুন। পাঁচ মাসের শিশু, পনেরোর কিশোর, পঁচিশের যুবক ও পঞ্চাশের প্রৌঢ়ের শরীর এক নয়। আমাদের শরিরের প্রতিটি অণু (বর্তমানে আমরা বলি দেহকোষ) প্রতিক্ষণে পরিবর্তিত হচ্ছে। পাঁচ মাসের শরীর ও পঞ্চাশ বছরের শরীর এক থাকেনা। একই ভাবে একই মানুষের পাঁচ মাসের মন, পনেরোর কিশোর মন, পঁচিশের যুবক মন ও পঞ্চাশের প্রৌঢ় মন এক থাকে না। এই মন্রূপ আত্মা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়।


মনের বাইরে কোন আত্মা নেই। মন বা চিত্ত-বিজ্ঞান প্রতিটি মুহূর্তে পরিবর্তিত হচ্ছে। কোন কিছু আমাদের আনন্দ দেয়, আবার কোন ঘটনা আমাদের দুঃখ। কখনো আমরা ক্রুদ্ধ হই, আবার কখণো বা ভীত। ফলে আমাদের মন বা আত্মাও পরিবর্তিত হচ্ছে।

প্রশ্ন আস্তেই পারে- মন বা আত্মা যদি ক্ষণিক হয়, তবে আমাদের অভিজ্ঞতা স্মৃতিরূপে মনে থাকে কী করে? উত্তরে বুদ্ধের মত- বংশের ধারা অনুসারে মা-বাবার কিছু রূপ-গুণ-দোষ সন্তান বা পরবর্তী প্রজন্মে দেখা যায়। তেমনই আমার পনের বছরের মন তার অভিজ্ঞতাকে উত্তরাধিকার সূত্রে পঞ্চাশ বছরের মনকে দেয়; আর তারই ফল স্মৃতি।


বুদ্ধ জানালেন, 'আত্মা বা চিত্ত-বিজ্ঞান যেহেতু শরীরেরই গুণ, তাই শরীর বিনাশের সঙ্গে সঙ্গে আত্মারও বিনাশ ঘটে।'


৩. কোন গ্রন্থকে স্বতঃপ্রমাণ বলে স্বীকার না করা:

বহু উপাসনা-ধর্মই নিজেদের ধর্মগ্রন্থকে 'স্বতঃপ্রমাণ' বলে বিশ্বাস করে। 'স্বতপ্রমাণ' কথার মানে- প্রশ্নাতীতভাবে চিরন্তন সত্য বলে ভেবে নেয়া, গ্রন্থে লিখিত প্রতিটি কথাকে প্রমাণ বলে মেনে নেয়া। কেন এই মেনে নেয়া? কারণ এইসব ধর্মগ্রন্থগুলো কোন মানুষের রচিত নয়। ঈশ্বরের দৈববাণী বা ঈশ্বর কথিত।

বুদ্ধের অন্যতম মূল সিদ্ধান্ত হল- 'কোন ধর্মগ্রন্থই স্বতঃপ্রমাণ হতে পারে না। সমস্ত দেশে, সমস্ত কালের জন্য ধর্মগ্রন্থের কথা সৎ বা শাশ্বত হতে পারে না। ধর্মগ্রন্থের প্রতিটি কথাকে বিনা প্রশ্নে মেনে নেয়ার অর্থ কার্য-কারণ সম্পর্ক খোঁজা থেকে বিরত থাকা।'


অর্থাৎ প্রতীত্যসমুৎপাদবাদকে অস্বীকার করা। অবিদ্যাকে প্রশ্রয় দেয়া। সম্যক দৃষ্টি বা সঠিক জ্ঞান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া। বস্তুত কোন গ্রন্তের প্রামাণিকতা নির্ধারিত হয় মানুষেরই জ্ঞান-বুদ্ধি, যুক্তি-বুদ্ধির দ্বারা। জ্ঞান-বুদ্ধি ও যুক্তি-বুদ্ধির প্রয়োগ ছাড়া কোন কিছুকে 'প্রমাণিত সত্য', 'প্রমাণিত শাশ্বত' বলে মেনে নেয়া বিজ্ঞান বিরোধী।


ঈশ্বর যখন অস্তিত্বহীন, তখন ঈশ্বরের দৈববাণী নিয়ে বা ঈশ্বরের কথা নিয়ে ধর্মগ্রন্থ গড়ে উঠেছে, এমন তত্বকে স্বীকার করা যায় না।

আড়াই হাজার বছর আগে ধর্মগ্রন্থগুলোর স্বতঃপ্রমাণ অস্বীকার করেছিলেন বুদ্ধ। কী বিশাল যুক্তিমনস্কতার পরিচয় তিনি সেই সময়ে দিয়েছিলেন, ভাবলে আজও বিস্মিত হতে হয়।


কোন ধর্মগ্রন্থকে স্বতঃপ্রমাণ বলে মেনে নেয়ার অর্থ, ওই গ্রন্থে লেখা কোন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার কেড়ে নেয়া। জিজ্ঞাসার মধ্য দিয়ে অগ্রগতির যে বিবর্তন আসে, তাকে ব্রোধ করা। যদি গ্যালিলিও বাইবেলের কথাকে স্বতঃপ্রমাণ বলে মেনে নিতেন, তবে তাঁর কাছে পৃথিবী গোল না হয়ে চ্যাপ্টাই থাকতো। গ্যালিলিও প্রমাণ করেছেন, বাইবেল স্বতঃপ্রমাণ কোন গ্রন্থ নয়। কোপারনিকাস প্রমাণ করেছেন, বাইবেলের কথা মেনে সূর্য পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে না।


বাইবেল-বেদ-গিতা-কোরান বা অন্য যে কোন তথাকথিত স্বতঃপ্রমাণ গ্রন্থই বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মিথ্যে বলে প্রমাণিত হয়ে চলেছে। আড়াই হাজার বছর আগে একজন বুঝেছিলেন, কোন ধর্মগ্রন্থই স্বতঃপ্রমাণ নয়, ঈশ্বর সৃষ্ট নয়। আড়াই হাজার বছর পরে আমরা একটুও না এগিয়ে আরো পিছিয়ে পড়েছি। 'আমরা' মানে সিংহভাগ তথাকথিত শিক্ষিতরা।


৪. জীবনপ্রবাহকে স্বীকার করা :

বুদ্ধের 'জীবনপ্রবাহ তত্ব' ও হিন্দু উপাসনা-ধর্মের 'জন্মান্তরবাদ' এক বিষয় নয়। বুদ্ধের মৃত্যুর পর বৌদ্ধ ধর্মে নানা বিভাজন এসেছে। হিন্দু ভাববাদী বা বৈদিক ভাববাদী প্রেরণা থেকে 'মহাযান'-এর উদ্ভব। মহাযানপন্থীরা বৌদ্ধধর্মের মূল চার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এল। তারা ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করল। বুদ্ধকে প্রথমে দেবতা, পরে সর্বোচ্চ দেবতার পরে বসাল। বুদ্ধের অবস্থান হল স্বর্গে। তিনি হলেন। তিনি হলেন বিভিন্ন দেব-দেবীর উপর প্রভুত্বকারী দেবতা। এল দেব-দেবীর পূজার বিধান। মুক্তির উপায় হিসেবে অষ্টাঙ্গিক মার্গ (বুদ্ধের আটটি উপদেশ) অনুশরণের প্রয়োজন ফুরালো। মুক্তির উপায় হিসেবে মন্ত্রের ব্যবহার অনুমোদিত হল। তারপর অনুপ্রবেশ ঘটল হিন্দু উপাসনা-ধর্মের, তন্ত্রের। আত্মার অমরত্ব স্বীকৃতি পেল। এল জন্মান্তরবাদ। গড়ে উঠল বুদ্ধএর জাতক কাহিনী, যা বুদ্ধের নানা জন্মান্তরের কাহিনী। বুদ্ধের জীবনপ্রবাহবাদকে হিন্দু উপাসনা-ধর্মের জন্মান্তরবাদের সঙ্গে গুলিয়ে দেয়া হল। অথচ বুদ্ধ কখনই আত্মাকে 'নিত্য' বলে স্বীকার অরেন নি। অনিত্য আত্মার জন্মও নেয়ার প্রশ্নই ওঠে না।


বুদ্ধের কথায়- জন্মান্তর বলতে চিরন্তন আত্মার নতুন দেহ ধারণ বোঝায় না। জন্মান্তর অর্থে একটি জীবন থেকে আরো একটি জীবনের উদ্ভবকে ভোঝায়, অর্থাৎ জীবনপ্রবাহকে বোঝায়। আমাদের মধ্যে যে চিত্ত-বিজ্ঞান প্রক্রিয়ার প্রবাহ রয়েছে, সেই চিত্ত-বিজ্ঞান প্রক্রিয়াই একটি মানুষের জীবন থেকে আরো একটি নতুন মানুষের জন্মে প্রবাহিত হয়।


জীবনপ্রবাহকে আরো স্পষ্ট করতে বুদ্ধ প্রদীপ শিখার উদাহরণ দিয়েছিলেন। একটি প্রদীপ থেকে যখন আরো একটি প্রদিপ জ্বালানো হয়, তখন প্রথম শিখা থেকে দ্বিতীয় শিখার জন্মও হয়। যদিও দুটি শিখা পৃথক ও স্বতন্ত্র, তবু একটা শিখা থেকে আরো একটা শিখার জন্মের মধ্যে প্রথম শিখার গুণ দ্বিতীয় শিখায় প্রবাহিত হল। তেমনি একটি জীবন থেকেই আরো একটি জীবনের সৃষ্টি হয়। সেই সঙ্গে প্রথম জীবনের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য বা গুণও প্রবাহিত হয় তার সৃষ্ট জীবনে। এই সৃষ্টি ও কিছু বৈশিষ্ট্যের ধারাবাহিক জীবনপ্রবাহ, জীব থেকে জীবের জন্মপ্রবাহ যতদিন থাকবে ততদিন চলবে।


বৌদ্ধ দর্শনের মহাপণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন (জন্মও ৪ সেপ্টেম্বর ১৮৯৩, মৃত্যু ১৪ এপ্রিল ১৯৬৩) দীর্ঘকাল বৌদ্ধদর্শন দিয়ে গবেষণা ও চর্চা করেছেন। বৌদ্ধধর্মে বস্তুবাদের রূপরেখা দেখতে পেয়েছিলেন। বুদ্ধকে জানতে, তাঁর দর্শনকে জানতে রাহুল তিব্বতি লামার ছদ্মবেশে তিব্বতে হাজির হন- একবার নয়, চারবার। সেখান থেকে গোপনে সংগ্রহ করে আনলেন অতি মূল্যবান বহু পউঁথি, পাণ্ডুলিপি, চিত্রপট ও পুস্তক। দেশ থেকে তিব্বতে চলে যাওয়া এইসব সম্পদ উদ্ধার করে এনেই থেমে থাকলেন না রাহুল। সে সব তিব্বতি ভাষা থেকে সংস্কৃতে অনুবাদ করেন। বৌদ্ধ ধর্ম বিষয়ে রাহুলের পাণ্ডিত্য নিয়ে গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করতেন আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় থেকে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় পর্যন্ত ভারতীয় পণ্ডিতেরা। তাই আমাদেরও রাহুলের মতকে গুরুত্ব দেয়া উচিৎ।


দার্শনিক জগদীশ্বর সান্যাল তাঁর 'ভারতীয় দর্শন' গ্রন্থে লিখেছেন, 'বুদ্ধদেব বলেন, জন্মান্তর বলতে চিরন্তন আত্মার নতুন দেহ ধারণ করা বোঝায় না। জন্মন্তর অর্থে একটি জীবন থেকে আর একতি জীবনের উদ্ভবকে বোঝায়।'


এরপর বলতেই হয়, বুদ্ধ কখনই হিন্দুত্ববাদীদের মত কিংবা জাতক কাহিনী-মার্কা জন্মান্তরে বিশ্বাস করতেন না।


দুঃখ এই, আমাদের দেশের মানুষ বুদ্ধকে সম্মান জানায় তাঁর মূল আদর্শের জন্য নয়, তাঁর আদর্শকে নিজেদের মনের মত বিকৃত করে নেয়ার পর।


অষ্টাঙ্গিক মার্গ :

দুঃখ বিনাশের পথ হিসেবে বুদ্ধ অষ্টাঙ্গিক মার্গের কথা বলেছেন। অষ্টাঙ্গিক মার্গকে তিনটি স্কন্ধে বা বিভাগে ভাগ করা হয়েছে।

১. প্রাজ্ঞা বা জ্ঞান, ২. শীল বা সদাচার ও ৩. সমাধি বা চিত্তের একাগ্রতা।


১. প্রজ্ঞা :

ক. সম্মা দিট্‌ঠি বা সম্যক দৃষ্টি (বুদ্ধ সঠিক জ্ঞান, যথার্থ দর্শনকে সম্যক দৃষ্টি বলেছেন)

খ. সম্মা সংকল্প বা যথার্থ সংকল্প (বুদ্ধ ক্রোধ-হিংসা-প্রতিহিংসা ত্যাগ করাকেই যথার্থ সংকল্প বলেছেন)


২. শীল :

গ. সম্মা বাচা বা যথার্থ বাক্য (বুদ্ধ যথার্থ বাক্য বলতে বলেছেন। তিনি বলেছেন, সত্য এবং প্রিয় ভাষণ দেবে। মিথ্যা ভাষণ, কটু বাক্য, হেতুহীন বা অপ্রয়োজনীয় কথা বলা থেকে বিরত থাকবে।

ঘ. সম্মা কম্মন্ত বা সৎ কর্ম (হিংসা, চুরি, ব্যাভিচার না করা)

ঙ. সম্মা আজীবা বা সৎ জীবিকা (বুদ্ধ বলেছেন, সৎ জীবিকা দ্বারা জীবন ধারণ ও পরিবার পালন করবে। অসৎ জীবিকা পরিত্যাগ করবে। অসৎ জীবিকা বলতে বুদ্ধ অস্ত্রব্যাবসা, প্রাণী-ব্যাবসা, মাংস ব্যাবসা, মদ্য ব্যাবসার উল্লেখ করেছেন। সুদ ব্যাবসা ও দেহব্যাবসা সেই সময়কার সমাজে প্রচলিত ছিল। এই দুই বিষয়ে বুদ্ধ বিড়ূপ কিছু বলেন নি।)


৩. সমাধি :

চ. সম্মা বায়াম বা যথার্থ ব্যায়াম (যথার্থ ব্যায়াম বলতে বুদ্ধ দৈহিক বা মনষিক ব্যায়ামের কথা বলেছেন। শারীরিক স্রম, সু-চিন্তা ভাবনা করা, ইন্দ্রিয়কে সংযত রাখার উপদেশ দিয়েছেন। কুচিন্তাকে দূরে রাখতে বলেছেন।

ছ. সম্মা মতি বা সম্যক মনন (সম্যক মনন বলতে বুদ্ধ মালিন্যহীন মনের কথা বলেছেন। চিত্ত যে ক্ষণস্থায়ী, এই বিজ্ঞানকে মনে রেখে অমলিন ও সুন্দর মনের প্রবাহ বজায় রাখতে উপদেশ দিয়েছেন।

জ. সম্মা সমাধি বা যথার্থ ধ্যান (বুদ্ধ বলেছেন, চিত্তের একাগ্রতার নামই সমাধি।)


বৌদ্ধ সংঘ :

মূলত সংসারত্যাগী মুক্তিকামী মানুষদের নিয়ে বুদ্ধ সঙ্ঘ গড়ে তোলেন। সঙ্ঘেরনিয়ম-কানুনে বুদ্ধ উপজাতি বা ট্রাইবাল সমাজের প্রচলিত প্রথাগুলোকে অনুসরণ করেছিলেন।


উপজাতি সমাজের অন্তর্ভূক্ত হবার দুইটি প্রথা আছে। ১. বয়ঃসন্ধিকালে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একজনকে সমাজের পূর্ণ সদস্য করা হয়। ২. বহিরাগত কেউ সমাজের সদস্য হতে গেলে সমাজের সকলের সদস্যের প্রয়োজন হয়। কেউ আপত্তি তুললে সদস্য করা হয় না। বৌদ্ধ সঙ্ঘে একই নিয়মের প্রচলন করেছিলেন বুদ্ধ। সঙ্ঘে যোগ দিতে চাইলে নাম, ঠিকানা, বয়স, পিতা-মাতার সম্মতির প্রমাণ ও অতীত ইতিহাস ঘোষণা করতে হত। সংঘের সকলের সম্মতি মিললে তাকে দীক্ষান্তে গ্রহণ করা হত। দীক্ষা গ্রহণকয়ারীর বয়স হতে হত অন্তত পনেরো বছর। কোন বিবাহিতা রমণী সঙ্ঘের সদস্য হতে চাইলে তার স্বামীর অনুমতির প্রয়োজন হত।


আদিম কিছু উপজাতি সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে কিছুই নেই। তেমনই সঙ্ঘ সদস্যের কোন ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না। দিনে একবার খাবার খেতেন। বিশেষ কোন খাবারের প্রতি আগ্রহ নিশিদ্ধ ছিল। পোশাক বলতে হলুদ রঙ্গে ছোপানো তিন টুকরা কাপড়। সঙ্গে ওষুধ রাখতে পারতেন ভিক্ষুরা। যে গ্রামেই ভিক্ষুরা থাকুন না কেন, অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় তাঁকে নিজের সংঘের সদস্যদের সঙ্গে মিলিত হতে হত।

সঙ্ঘ পরিচালিত হত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। সঙ্ঘ-প্রধান নির্বাচিত হতেন। উত্তরাধিকারী নিয়োগ নিষিদ্ধ ছিল। কোন গুরুত্বপূর্ণ নিষয় নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন হলে তা সকলের উপস্থিতিতেই হত। সমবেত জীবনচর্চা ও গণতন্ত্র ছিল সঙ্ঘের বৈশিষ্ট।


ত্রিপিটক :

বুদ্ধ নিজে কোন গ্রন্থ রচনা করেননি। তাঁর মৃত্যুর পরে কিছু বৌদ্ধ সন্ন্যাসী তিনটি 'পিটক' বা পেটি রচনা করেছিলেন। তিনটির একত্রিত নাম ত্রিপিটক। পিটক তিনটি হল :

১. বিনয়পিটক : এতে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আচরণ সঙ্ক্রান্তকিছু নির্দেশ আছে।

২. সূত্তপিটক : এতে আছে বুদ্ধের জাতক কাহ্নী। এর আবার পাঁচটি ভাগ- ক. দীর্ঘনিকায়, খ. মঝ্‌ঝিম নিকায়, গ. সংযুক্ত নিকায়, ঘ. অঙ্গুত্তর নিকায় ও ঙ. খুদ্‌দক নিকায়।

৩. অভিধম্মপিটক : এতে আছে দার্শনিক আলোচনা।


বৌদ্ধধর্মে বিভাজন :

বুদ্ধের মৃত্যুর পর সঙ্ঘগুলোর মধ্যে বিভেদ শুরু হতে থাকে। প্রাচীনপন্থী বৌদ্ধদের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদী বৌদ্ধদের একটু একটু করে বাড়তে থাকে। বৌদ্ধ সাহিত্যগুলোতেও তার প্রতিফলন বাড়তে থাকে।


প্রাচীনপন্থীরা বা হীনযানপন্থীরা দাবি করেন, তারা বৌদ্ধ ধর্মের প্রকৃত চিন্তাধারাকে অবিকৃতভাবে ধরে রেখেছেন। সে দাবিকে অবশ্য উড়িয়ে দেয়া যায় না। তারা মনে করেন- বুদ্ধ একজন মানুষ ছিলেন। তিনি বহুগুণাবলীর অধিকারী ছিলেন। তাঁর মানবিক দুর্বলতাও ছিল, যেমন অসহিষ্ণুতা, রোগকাতরতা (চাতুমা-সুত্ত, সেখ-সুত্ত) ইত্যাদি।


একসময় প্রাচীনপন্থীরা সাতটি উপদলে ভাগ হয়ে যায়। মহাযানপন্থীরাও তাদের বিভাজন ঠেকাতে পারেননি। তারা আঠারোটি সম্প্রদায়ে ভাগ হয়ে যায়।

হীনযানপন্থীরা রইলেন বুদ্ধের নীতি নিয়ে। মহাযানপন্থীরা আবদ্ধ রইলেন বুদ্ধকে ঈশ্বর বানিয়ে পুজো করার মধ্যে। সঙ্গে যুক্ত করলেন তন্ত্র-সাধনা। মহাযানপন্থীদের হাতে শুরু হল বৌদ্ধ ধর্মের অবক্ষয়।


নির্বান :

'নির্বান' মানে 'নিভে যাওয়া'। যেমন প্রদীপের আগুন জ্বলতে ক্বলতে নিভে যাওয়া। বৌদ্ধ ধর্মে 'নির্বান' শব্দটির গুরুত্ব খুবই বেশি। বুদ্ধ 'নির্বান' বলতে কী বোঝাতে চেয়েছিলেন, এই নিয়ে পরবর্তীকালে বৌদ্ধদের মধ্যে যথেষ্ঠ মতভেদ দেখা দেয়। এর কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের উপর বিভিন্ন অঞ্চলের সংস্কৃতি ও ধর্মের প্রভাব। 'নির্বান' বিষয়ে প্রধান তিনটি মত নিয়ে নিচে আলোচনা করা হল :


১. বুদ্ধের মতে, জীবনে দুঃখ আছে, দুঃখ নিবারণের বা নির্বাপনের পথও আছে। দুঃখের পরিসমাপ্তির নামই 'নির্বান'। বুদ্ধের মতে চার 'আর্যসত্য' বা মৌলিকসত্য হল ক. দুঃখ, খ. দুঃখের কারণ, গ. দুঃখের কারণ বিনাশের উপায় ও ঘ. বিনাশ।

এই চার আর্যসত্য হল বৌদ্ধ ধর্মের মূল কথা। এই মূল কথা মেনে নিলে আমরা বনা দ্বিধায় মেনে নিতে পারি যে- দুঃখের বিনাশই নির্বান।


২. 'চিরবিলুপ্তি'। বৌদ্ধ দার্শনিক হিসেবে নাগসেন অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত একটি নাম। নাগসেনের জন্মও আনুমানিক ১৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে। মগধে নন্দ যখন রাজত্ব করছেন, সেই সময় আলেকজান্ডার গান্ধার (বর্তমান পাঞ্জাব) অঞ্চল আক্রমণ করেন ও দখল করেন। ফলে গান্ধার অঞ্চলে লাখখানেক গ্রিক বসবাস শুরু করেন। এদের মধ্যে সেনা-ভাস্কর-শিল্পী-ব্যবসায়ী ইত্যাদি বিভিন্ন পেশার মানুষ ছিলেন। ভারতবর্ষে বসবাসকারী গ্রীকদের সঙ্গে রাজধর্ম বৌদ্ধদের মত বিনিময়ের সুযোগ ছিল এবং মত বিনিময় হত। গ্রিক ভাস্কররাই বুদ্ধকে কল্পনা করে নিজেদের শৈলীতে সৃষ্টি করেছিলেন পাথর খোদাই বুদ্ধ মূর্তি। পাশাপাশি ভারতীয় দর্শনের উপর গ্রিক দার্শনিকদের প্রভাব পড়েছিল। 'যবন' বা 'ম্লেচ্ছ' বলে হিন্দুধর্মের মানুষেরা গ্রিকদের এড়িয়ে চলত। বৌদ্ধরাই ভারতীয় ভাবধারার সঙ্গে যবন গ্রিকদের ভাব্ধারা বিনিময়ে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল।


নাগসেনের জন্মও হয়েছিল শিয়ালকোটের কাছে। গ্রিক রাজা মিনান্দর বা মিলিন্দ এর রাজ্যের একটি রাজধানী ছিল শিয়ালকোট। মিনান্দর ছিলেন তার্কিক। ভালোবাসতেন শাস্ত্রচর্চা। মিনান্দর প্রকাশ্য সভায় বহু বৌদ্ধ শ্রমণদের প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে তুলতেন। বৌদ্ধ সঙ্ঘের অনুরোধে নাগসেন শিয়ালকোটের অসংখেয় সঙ্ঘে হাজির হন ও মিনান্দরের সঙ্গে শাস্ত্র আলোচনা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মিনান্দর ৫০০ অমাত্য নিয়ে অসংখেয় মঠে হাজির হন। তাদের এই আলোচনা 'মিলিন্দ প্রশ্ন' (অনুবাদক : ভিক্ষু জগদীশ কাশ্যপ) থেকে জানা যায়। 'মিলিন্দ প্রশ্ন'-তে নির্বান প্রসঙ্গ এসেছে। নাগসেন ও মিলিন্দ-র প্রশ্ন ও উত্তরের কিছু নমুনা-


মিলিন্দ - প্রভু, নিরোধ হওয়াকেই কি নির্বান বলে?

নাগসেন - হ্যাঁ মহারাজ। জ্ঞানী ব্যক্তি (যিনি অবিদ্যাকে দূর করেছেন) বিষয় তৃষ্ণায় ও ভোগে লিপ্ত হন না। ভোগের তৃষ্ণা তারা নিরোধ করতে পারেন। সকল দুঃখই রুদ্ধ হয়ে যায়। মহারাজ, এই ধরণের নিরুদ্ধ হওয়াকেই নির্বান বলে।

মিলিন্দ - বুদ্ধ কোথায় আছেন?

নাগসেন - মহারাজ, তিনি পরম নির্বান প্রাপ্ত হয়েছেন, যার পরে তাঁর ব্যক্তিত্বকে তৈরি রাখারমত আর কিছুই থাকতে পারে না...

মিলিন্দ - প্রভু, উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দেন।

নাগসেন - মহারাজ, নির্বাপিত অগ্নিশিখা কি আর দেখা যায়?

মিলিন্দ - না প্রভু। সে শিখা তো নির্বাপিত।


'নির্বান' অর্থে নাগসেন বিষয় তৃষ্ণা ও অবিদ্যার চির-বিনাশকে শুধু বোঝাননি, দেহেরও চির-বিলুপ্তির কথা বলেছেন।

নির্বানেই সব শেষ। গৌতম প্রায় ৩৫ বছর বয়সে নিজের দুঃখময় জগৎ থেকে নির্বান লাভ করে বুদ্ধ হয়েছিলেন। বুদ্ধ নির্বান লাভের পরেও দীর্ঘ বছর বেঁচে ছিলেন। এ থেকে আমরা ধরে নিতে পারি- বুদ্ধ 'নির্বান' অর্থে চিরবিলুপ্তি বোঝাননি।


৩. আনন্দময় অবস্থাই 'নির্বান' - এমনটাই মনে করেন মহাযানপন্থী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বৌদ্ধরা। মহাযান বৌদ্ধধর্মে স্থানীয় অসংখ্য দেবদেবীর অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। ফলে বৌদ্ধধর্মে স্থানীয় অসংখ্য দেবদেবীর অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। যে বুদ্ধ ছিলেন যুক্তিবাদী, নিরীশ্বরবাদী সেই বুদ্ধের ধর্মে যুক্ত হল বহু দেব-দেবীর পুজো, কার্য-কারণ সম্পর্কহীন (প্রতীত্যসমুৎপাদবাদ বিরোধী) অলৌকিক বিশ্বাস। গৃহীত হল যৌন-আচারমূলক তন্ত্র-সাধন পদ্ধতি। বৌদ্ধতন্ত্রগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য 'গুহ্যসমাজ' বা তথাগত গুহ্যক ও 'মঞ্জুশ্রীমূলককল্প'। এতে মাংস, মুদ্রা (বিভিন্ন মৈথুন-ভঙ্গি) ও মৈথুনকে সাধনার অঙ্গ বলা হয়েছে। বুদ্ধের সঙ্গে নানা দেবীর মৈথুন বর্ণনা বৌদ্ধ তন্ত্রে আছে।


মহাযানপন্থীদের বৌদ্ধ তন্ত্র অনুসারে দীর্ঘস্থায়ী মৈথুনের মধ্যেই শুধু পাওয়া যায় অপার আনন্দ অনুভূতি, তখন সমস্ত মানসিক ক্রিয়া হারিয়ে ফেলে মানুষ। মিলনের এই অপার আনন্দই হচ্ছে 'নির্বান'।


বুদ্ধের মূল সিদ্ধান্ত ও উপদেশকে উড়িয়ে দিয়ে ধর্মের নামে 'নির্বান' প্রসঙ্গে নাগসেনের দেয়া সংঙ্গা ও মহাযানপন্থীদের দেয়া সংঙ্গা আমরা গ্রহণ করতে পারি না। বরং আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, মহাযানপন্থীদের পরিবর্তিত বৌদ্ধ ধর্ম স্পষ্টতই বুদ্ধ বিরোধী। তাদের 'নির্বান' সংঙ্গা হিন্দু তন্ত্রের দ্বারা পরিপূর্ণভাবে প্রভাবিত। আর নাগসেনের মতামত বুদ্ধের মত থেকে সামান্য সরে আসা। তাই আমরা 'নির্বান' শব্দটির সংঙ্গা হিসেবে প্রথমটিকেই গ্রহণ করব।

'নির্বান' অস্তিত্বের নাশ নয়। 'নির্বান' মৈথুনে ডুবে থাকার ভণ্ডামী নয়। গৌতম 'নির্বান' লাভ করে 'বুদ্ধ' হয়েছিলেন এই তথ্যই প্রমাণ করে 'নির্বান' মানে, দুঃখের বিনাশ।

বর্তমান বুদ্ধ বিরোধী মহাযানপন্থার ব্যাপক প্রচলন হয়েছে তিব্বত, চীন, জাপানে। ভারতে বৌদ্ধের সংখ্যা কম আর এদের মধ্যে মহাযানপন্থীদের সংখ্যাই বেশি। ফলে এ সব দেশে নিরীশ্বরবাদী বুদ্ধ ঈশ্বররূপে পূজিত হচ্ছেন। হীনযানপন্থার প্রসার ঘটেছে স্রীলঙ্কা, মায়ানমার, থাইল্যান্ডে। এসব দেশে বৌদ্ধধর্ম কিছুটা হলেও মতাদর্শ রক্ষা করতে পেরেছে।

হীনযান ও মহাযানপন্থীরা বর্তমানে নানা ভাগে বিভক্ত। নতুন নতুন বিশ্বাস ও ভাবধারার অনুপ্রবেশের জন্যই এত বিভাজন।

বৌদ্ধ দর্শনের উপর নির্ভর করে, নানা বিভাজিত বুদ্ধের মতবাদের উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা সাহিত্য-দর্শন-ইতিহাস-ধর্মগ্রন্থের সংখ্যা এতই বিপুল যে, কারও পক্ষেই এক জীবনে পড়ে ওঠা সম্ভব নয়।





ভারতবর্ষের তদকালীন সমাজব্যবস্থা এবং বুদ্ধ :

বুদ্ধের সময়কার সমাজে ব্যাপক ক্রীতদাস প্রথা ছিল, ভয়ংকর দারিদ্র্য ছিল। অত্যন্ত চড়া সুদে ঋণ দিতেন শ্রেষ্ঠী, বণিক, ধনী সম্প্রদায়। ঋণে জামিন হিসেবে সম্পত্তি না রাখতে পারলে বউ, বোন বাঁধা রাখতে হত ঋণদাতার কাছে। এই মহিলাদের শ্রমের সঙ্গে দেহ দিতে হত। এরপর ঋণ শোঢ না হলে ঋঙরহীতাকে দাস থেকতে হত ঋণদাতার কাছে। দারিদ্র্য ও দাসত্বের এই যন্ত্রণা ও দুঃখছিল ভয়ংকর। শ্রমজীবী শূদ্রদের জীবনও ছিল বিভীষিকাময়। দিন থেকে রাত কঠোর শ্রমের বিনিময়ে এক বেলা উচ্ছিষ্ট খাবার মিলত। ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলোতে যাদের শূদ্র বলে ঘোষণা করা হয়েছিল, বৌদ্ধ গ্রন্থে তারাই চণ্ডাল, নেসাদ, পুক্কুস নামে পরিচিত। পরিচয় পাল্টালেও ধনী মহাজনদের উৎপীড়ণ একই রইল।


শোষক-শাসক বা রাষ্ট্র গ্রাম থেকে সম্পদ সংগ্রহ করত চার ভাবে। ১. উৎপন্ন ফসলের উপর কর, ২. বাধ্যতামূলক শ্রম, ৩. রাজার জন্য ফসলের অংশ সংগ্রহ ও ৪. রাজাকে দেয়া আবশ্যিক কর। এই কর আদায় ছিল নিষ্ঠুর অত্যাচারমূলক। শারীরিক নির্যাতন, সম্পত্তি লুণ্ঠন, ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া, নারীদের উপর অত্যাচার- কী না হত! এই অত্যাচারের শিকার শুধু গ্রামের কৃষকেরা হত না, অন্যান্য বৃত্তিজীবী যেমন কট্টক (ছুতোর), কর্মার (কামার), মোদক (মাটি কাটার শ্রমিক), কুম্ভকার (কুমোর), রজ্জুবর্তক (দড়ি শ্রমিক) -রাও উৎপীড়িত হত। বোঝার ওপর শাকের আঁটির মত মহাজনদের ঋণের বোঝা তো ছিলই। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে পাচ্ছি, মৌর্য সাম্রাজ্যে সুদের হার ছিল শতকরা বার্ষিক ২৪০ মুদ্রা। পরে তা অর্ধেক করা হয়েছিল।


এই সামাজিক পরিস্থিতিতে দেখা যেত, কোন ঋণগ্রহিতা যদি বুঝতে পারতো, তার পক্ষে ঋণ শোধ করা অসম্ভব, তখন ক্রীতসাস জীবনের দুঃখ-যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে বৌদ্ধ ভিক্ষু হয়ে যেত। এর ফলে শ্রেষ্ঠী ও মহাজনদের মধ্যে বুদ্ধের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমে ওঠে। অবস্থা সামাল দিতে বুদ্ধ ঘোষণা করেন, 'ঋণী ব্যক্তিকে প্রবজ্যা (ভিক্ষু হতে দীক্ষা) দেয়া অনুচিত।' (মহাবগ্‌গ ১৩/৪/৮ ও বিনয়পিটক)


ক্রীতদাসরা তাদের দাসত্ব জীবনের দুঃখ-যন্ত্রণা এড়াতে ভিক্ষু হতে শুরু করেন। দাস মালিকরা বুদ্ধের উপর ক্রুদ্ধ হলেন। দাস-মালিকদেররাগ থামাতে বুদ্ধ আবার ঘোষণা করলেন, 'ক্রীতদাসদের জন্য প্রবজ্যা অনুচিত।' (মহাবগ্‌গ ১/৩/৪/৯) জেনে রাখা ভাল, বৌদ্ধ সংঘে ক্রীতদাসেরা শ্রম বিনিময় করত খাবারের বিনিময়ে।

মগধ সম্রাট বিম্বিসারের বহু সেনা যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করে বৌদ্ধ ভিক্ষু হতে শুরু করে। বিম্বিসারের রাজশক্তি সেনানির্ভর। সুতরাং বুদ্ধ ধর্মের প্রতি অনুগামী বিম্বিসারের বুদ্ধের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা আর রইল না। তিনি রাজসভায় মন্ত্রীদের সঙ্গে পরামর্শের পর ঘোষণা করলেন, সেনাদের ভিক্ষু হিসেবে দীক্ষা দিলে বৌদ্ধগণ বা সঙ্ঘ অবিলম্বে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া হবে। বৌদ্ধ ধর্মগুরুর শিরোচ্ছেদ করা হবে। বিম্বিসারের ক্রোধ থেকে বাঁচতে ও সংঘকে বাঁচাতে বুদ্ধ আর এক দফা ঘোষণায় জানালেন, 'রাজসৈনিকদের প্রবজ্যা অনুচিত।' (মহাবগ্‌গ ১/৩/৪/২, বিনয়পিটক)


শ্রেণীগতভাবে বুদ্ধ গোষ্ঠীপতি ধনী পরিবারের সন্তান। সে'ভাবেই বড় হয়েছেন। গরীবদের বাস্তব জীবনের চরম দারিদ্র্য ও দুঃখের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না। দুঃখকে তিনি অনুভব করেছিলেন বৃদ্ধ, অসুস্থতা ও মৃত্যু দেখে। এই দেখে তিনি মানসিক আঘাত পেয়েছেন। দুঃখের কারণ খুঁজতে গিয়ে তিনি তৃষ্ণা ও অবিদ্যাকে দায়ী করেছেন। এ সবই পুরোন কথা। দুঃখকে জয় করতে কিছু শীল বা নীতি পালনের উপদেশ দিয়েছেন। কিন্তু যে কথা গভীরভাবে বলা দরকার, সেটা বোধ হয় নাবলাই থেকে গেছে।


শ্রমজীবী বা ক্রীতদাস পরিবারে জন্মালে বুদ্ধ উচ্চবর্ণের শোষণ ও অত্যাচার প্রতিটি দিক অনুভব করতে পারতেন। অত্যাচারের কারণগুলো, দুঃখের কারঙুলো তাঁর কাছে ধরা পড়েছে। কিন্তু তদকালীন রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে কিছু করার বা বলার মত কোন বাস্তব অবস্থা ছিল না। শোষক-শাসক-রাষ্ট্রশক্তির বিরোধিতা করার চিন্তা ছিল আত্মহননের নামান্তর। ফলে তাঁকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আপস করতে হয়েছিল।


বুদ্ধের যুগেই বণিকশ্রেণী জাতে ওঠে। তাদের রমরমা বাড়ে। বৈদিক যুগে বা ব্রাহ্মণদের বোলবোলাওয়ের যুগে বণিক বা শ্রেষ্ঠী শ্রেণীকে 'বৈশ্য' বলা হত। তারা ছিল উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক। বুদ্ধ এই উঠে আসা নতুন শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করতে যে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন, তার প্রমাণ মেলে 'বুদ্ধ সুত্তনিপাত' গ্রন্থে। গ্রন্থটিতে একটি নিষেধের তালিকা আছে। এই তালিকা অনুসারে দেখা যাচ্ছে, ক্রীতদাস প্রথা, সুদ আদায়ের নামে ক্রীতদাস তৈরির ফাঁদ, বণীকশ্রেণীর চিত্ত বিনোদনের জন্য গণিকাবৃত্তি নিন্দিত হয় নি। বণিক সমাজের স্বার্থেই নিন্দিত হয় নি, বরং ঋণ শোধ না করা, দাসত্ব থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে পালিয়ে যাওয়াকে অন্যায় ঘোষণা করা হয়েছে। বুদ্ধের পশু হতায়র বিরোধিতা বণিকশ্রেণীর স্বার্থকেই রক্ষা করেছিল, কারণ ওই সময় সম্পদ হিসেবে পশুকে গণ্য করা হত।


সব মিলিয়ে বৌদ্ধ ধর্মকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিক, বণিক-মহাজন, রাজশক্তি তাদের সহায়ক শক্ত্রি বলে মনে করেছিল। ফলে শ্রেষ্টী থেকে সম্রাট প্রত্যেকেই উদার হাতে স্বর্ণমুদ্রার ঢের লাগিয়ে দিয়েছিল, উদ্যান দিয়েছিল, সংঘ তৈরি করে দিয়েছিল, উপঢৌকন হিসেবে দিয়েছিল প্রচুর ক্রীতদাস। বৌদ্ধ ধর্ম হয়ে পড়েছিল রাজধর্ম, উচ্ছবর্ণের ও উচ্চবিত্তের ধর্ম। যদিও একথা ঠিক, শোষিত শূদ্ররাও বৌদ্ধ ধর্মকে গ্রহণ করে ঘৃণ্য জীবন থেকে মুক্তি পেয়েছিল।

উচ্চবর্ণের ভারতীয় দার্শনিক ও ঐতিহাসিকরা বুদ্ধকে উপজাতীয় থেকে ক্ষত্রিয় বানিয়ে ছেড়েছেন। শুদ্ধোধনকে বানালেন রাজা। অছচ বুদ্ধের সময়কার ব্রাহ্মণ ও উচ্চবর্ণের মানুষদের কাছে বুদ্ধ ছিলেন নীচবংশীয় মানুষ।


বিভিন্ন গ্রন্থে বুদ্ধকে 'বৃষল' বা 'নীচজাতীয়' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজা থেকে বণিকরা যখন বুদ্ধকে ধর্মগুরু হিসেবে গ্রহণ করল, তখন তাদের আত্মসম্মানের স্বার্থে বুদ্ধকে রাজা বলে ঘোষণা করেন। পরের পর্যায়ে তাঁকে ভগবান বিষ্ণুর অবতার, তারপর ভগবানেরও ভগবান বানানো হল। নিরীশ্বরবাদী বুদ্ধ ঈশ্বর হয়ে গেলেন। আমরা ব্রাহ্মণ্যবাদী দার্শনিকদের কাছে ততটাই জানলাম, যতটা তারা জানালেন আমাদের বুদ্ধু বানাতে।

সময় বিশ্লেষণ এড়িয়ে বুদ্ধের শ্রেণীচরিত্র বিশ্লেষণ করলে তা হবে অবাস্তব, অসার। কোন সময়ে বুদ্ধ এসেছিলেন? একটু ফিরে দেখা যাক। সে সময় রাজশক্তি ছিল ভয়ংকর নিষ্ঠূর, উশৃঙ্খল, খামখেয়ালী চেহারার। কোশল রাজশক্তি বুদ্ধের চোখের সামনেই তাঁর জাতিগোষ্ঠী শাক্যদের নির্বিশেষে হত্যা করেছে। শিশু-নারী-বৃদ্ধ কেউই রেহাই পায় নি।


বুদ্ধের চোখের সামনেই মগধরাজ অজাতশত্রুর আক্রমণে বিদেহ, জ্ঞাতৃক, লিচ্ছবি ও বৃজি উপজাতিরা ধ্বংস হয়ে গেল। বৃজি সাধারণতন্ত্রের সভাপতি চেটক (মহাবীর জৈন-এর মামা) পরাজিত হয়ে আত্মহত্যা করলেন। হত্যা তখন বীরত্বের প্রতীক। পরাজিত রাজ্যে লুণ্ঠন ও ধর্ষণ ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। তখন পাপ-পুণ্য, উচিত-অনুচিত বিচার করা বা এই বিষয়ে কিছু বলা পাগলামো ছাড়া আর কিছুই নয়। এমন এক ভয়ংকর, ভয়াবহ সময়ে গৌতম বুদ্ধ ও মহাবীর জৈনের আবির্ভাব। সেই সময়কার হত্যা, রক্তপাত, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগের ব্যাপকতায় অনেক চিন্তাবিদ হতবুদ্ধি ও বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। জৈন চিন্তাবিদ গোশাল মংখলিপুত্ত এত বর্বর হিংস্রতা দেখে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন। সমসাময়িক চিন্তানায়ক ও ধর্মগুরু পূরণ কস্‌সপ, পকুধ কচ্চায়ন, অজিত কেশকলম্বী, সঞ্জয় বেলট্‌ঠিপুত্ত সে সময়কার রক্তক্ষয়ী অবস্থা দেখে নিরাশ হয়েছিলেন। তাঁদের মনে হয়েছিল, সমাজে ন্যায়বোধ ও অহিংসার প্রতিষ্ঠা, লোভের অবসান ঘটানো বাস্তবে সাধ্যাতীত। রাজশক্তির অনিবার্য লোভ, ক্রোধ, ঈর্ষা, পরশ্রীকাতরতা, ভোগতৃষ্ণা রোধ করা অসম্ভব। মহাশক্তিধর, খামখেয়ালি রাজশক্তির বিরুদ্ধে কথা বলার অর্থ নিজের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করা।


এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে বুদ্ধের পক্ষে রাষ্ট্রষক্তির বিরোধিতা করার অর্থ অনিবার্য মৃত্যুকে ডেকে আনা। তাই তিনি রাজশক্তির রোষ থেকে বাঁচতে ঋণগ্রহীতা দাস ও সেনাদের ভিক্ষু করা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। চেতনার ও যুক্তিবাদের বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন যে মানুষটি, তাঁর বেঁচে থাকাটা সংস্কৃতির প্রগতির জন্যেই অত্যন্ত জরুরি ছিল। অতি-বিপ্লবীপনা দেখাতে গিয়ে তিনি যে কোন হঠকারি সিদ্ধান্ত নেননি, রাষ্ট্রশক্তির সঙ্গে প্রয়োজনীয় আপস করে কৌশল্গত ভাবে ঠিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন- এ বিষয়ে সন্দেহর কোনও অবকাশ নেই।


বৌদ্ধ যুগে স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চারুকলা, চিকিৎসা বিজ্ঞান, যৌনবিজ্ঞান সহ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা বিশাল রকমের উন্নতি ঘটিয়েছিল। এই উন্নতির মান এতটাই ক্লাসিকাল বা চিরায়ত ছিল যে, পরবর্তী সময়ে সুদীর্ঘ কাল ধরে তা আদর্শ ও অনুসরণযোগ্য বলে গৃহীত হয়েছিল। চরক, সুশ্রুত, নাগার্যুন, ভাস্করাচার্য, বাৎসায়ন, কৌটিল্য, পাণিনি, অশ্বঘোষ প্রমুখ মননশীল পণ্ডিতরা ছিলেন বৌদ্ধ বা বৌদ্ধভাবাশ্রয়ী। বৌদ্ধ যুগে একটা সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটে গিয়েছিল।


বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি গ্রীক, কুষাণ, শক রাজাদের সমর্থন :

বৌদ্ধ ধর্ম বিভিন্ন রাজাদের সমর্থন ও আর্থিক সাহায্য পেয়েছিল। এমন সাহায্য পাওয়ার জন্য কেউ কেউ বৌদ্ধধর্মকে 'প্রতিক্রিয়াশীল ধর্ম', 'রাজশক্তির ধর্ম' বলে চিহ্নিত করে থাকেন। সত্যি এটা একটা জরুরি প্রশ্ন- কেন গ্রিক, কুষাণ, শক রাজার বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন?



হিন্দুধর্মে ধর্মান্তর ছিল অত্যন্ত কঠিন। সাধারণত জন্মগতভাবেই একজন হিন্দু হয়। হিন্দুধর্মের বর্ণপ্রথা এতটাই প্রবল ছিল যে, বর্ণপ্রথা বাদ দিয়ে হন্দু ধর্মকে ভাবাই যেত না। কোন পুরুষ নিচু বর্ণের কোন নারীকে বিয়ে করলেই নারী উঁচু বর্ণে স্থান পেত না। এমনকী, তার সন্তান্রাও মনুর ধর্মীয় আইন অনুসারে বহুভাবে বঞ্চিত হত। স্ত্রী রক্ষিতার বেশি মর্যাদা পেত না।


বিদেশ থেকে যেসব রাজারা এদেশে প্রবেশ করেছিলেন তাদের আন্তরিক ইচ্ছা ছিল এদেশেরই একজন হবার। এদেশের মেয়েদের বিয়ে করে ঘর বসাবার। হিন্দুধর্মের ছড়ি যাদের হাতে, তাদের একটা সমস্যা ছিল। এইসব বিদেশি রাজা আর তাদের সেনাদের কোন বর্ণের খোপে ঢোকাবে? কারণ বর্ণ তো জন্মগত ব্যাপার!

ভারতবর্ষে তখন বৌদ্ধ ধর্ম রয়েছে। বৌদ্ধ ধর্ম হল উদার। জাত-পাত-বর্ণ নেই। সবাইকে গ্রহণ করতে হাত বাড়িয়েই আছে। এই অবস্থায় বিদেশ থেকে আগত রাজশক্তি বৌদ্ধ ধর্মকে গ্রহণ করাকেই সম্মানজনক মনে করেছিলেন। এই কারণেই গ্রিক, শক, কুশান প্রভৃতি রাজশক্তি ও তাদের সঙ্গে আসা সৈন্য-সামন্ত বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিল। ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই বৌদ্ধ ধর্ম রাজশক্তির সহযোগিতায় তুঙ্গে উঠেছিল।


বিদেশি রাজারা বৌদ্ধধর্মকে সমস্ত রকমভাবে সাহাহ্য করছেন দেখে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা তাদের গোঁড়ামি কিছুটা কমালো। বা বলতে পারি বৌদ্ধ ধর্মের উত্থান ঠেকাতে কিছুটা কৌশল গ্রহণ করল। তারা গ্রিক, শক, কুষাণদের 'পতিত ক্ষত্রিয়' বলে আখ্যা দিল। এতে দুটি ঘটনা ঘটল। ১. ব্রাহ্মণ্যবাদীদের বর্ণপ্রথা বড় ধরণের ধাক্কা খেল। ব্রাহ্মণ্যবাদীদের একটা বড় অংশই বর্ণের নতুন সমীকরণ মেনে নিল না। ২. সমাজের বহু নিচু বর্ণের মানুষ বিদেশিদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে সমাজের দু-এক ধাপ উপরে উঠতে চেষ্টা করল।


এরপর একটা প্রশ্ন উঠে আস্তেই পারে, অশোক তো বিদেশি ছিলেন না, তিনি কেন বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন? অশোক তাঁর রাজত্বকে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত করেছিলেন। এই বিস্তৃতির পেছনে সামরিক শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন হয়েছে। যুদ্ধ, হত্যা, লুণ্ঠন, রক্তপাত ইত্যাদি দেখে এক সময় হিংসার প্রতি তাঁর বিরাগ জন্মেছিল। তারই পরিণতিতে অশোক অহিংস বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। সাম্রাজ্য জুড়ে বহু ধর্মলিপি খোদিত করিয়েছিলেন।


বৌদ্ধদের 'বৌদ্ধ সঙ্গীতি' বা মহাসম্মেলন

অশোক,কুষাণ সম্রাট কনিষ্ক বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি এতটাই জরিয়ে পড়েছিলেন যে, বৌদ্ধ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। বুদ্ধের মৃত্যুর অল্প কিছুকালের মধ্যে রাজগৃহে প্রথম 'বৌদ্ধ সঙ্গীতি' বা মহাসম্মেলন হয়েছিল। দ্বিতীয় মহাস্মমেলন হয়েছিল বৈশালীতে বুদ্ধের মৃত্যুর একশো বছর পরে। এই সম্মেলনে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দশটি কাজকে সংঘবিরোধী বলে ঘোষণা করেন বুদ্ধপন্থীরা। তখন আর একটি পৃথক মহাসম্মেলন করে নব্যপন্থী দশটি বিষয়কেই নিয়মসিদ্ধ বলে ঘোষণা করেন। তারা নিজেদের 'মহাসংঘিক' ও প্রাচীনপন্থীদের 'স্থবিরবাদী' বলে পরিচয় দেন। এই মহাসংঘিক্রাই পরবর্তীতে মহাযানপন্থী ও স্থবিরবাদীরা হীনযানপন্থীতে রূপান্তরিত হন।


সম্রাট অশোকের পৃষ্টপোষকতায় পাটলিপুত্রে তৃতীয় বৌদ্ধ সম্মেলন হয়েছিল। এটা ছিল স্থবিরবাদীদের সম্মেলন। এই সম্মেলনে ন্য মাস পরিশ্রমে স্থবিরপন্থী বোউদ্ধ পণ্ডিতরা 'স্থবিরবাদী ত্রিপিটক' রচনা করেন। এরপর অশোক দেশ-বিদেশে বৌদ্ধ ধর্মপ্রচারক পাঠান। যেসব অঞ্চলে প্রচারক্রা গিয়েছিলেন সেসব অঞ্চলে হীনযানপন্থীরাই প্রবল।


চতুর্থ বৌদ্ধ মহাসম্মেলন হয়েছিল কনিষ্কের পৃষ্ঠপোষকতায় কাশ্মীরে অথবা জলন্ধরে। সম্মেলনে স্থবিরপন্থীদের ও মহাসংঘিকদের বিভাজন স্পষ্ট রূপ পেল। এটা ছিল খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের ঘটনা। নাগার্জুন মহাযানপন্থীদের নির্দিষ্ট রূপ দেন। পরবর্তীতে মহাযানপন্থীরা নিজেদের মত করে ত্রিপিটকে কিছু কিছু বিকৃতি ঘটাল। মহাযান থেকেই তান্ত্রিক-বৌদ্ধধর্মের উদ্ভব।


তথ্যসূত্র :

১. ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস - নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য

২. বৌদ্ধ দর্শন - রাহুল সাংকৃত্যায়ন

৩. অলৌকিক নয় লৌকিক (তৃতীয় খণ্ড) - প্রবীর ঘোষ


চার্বাক মতবাদ

চার্বাক মতবাদ প্রাচীন ভারতের নিরীশ্বরবাদী মতবাদগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি একই সঙ্গে নিরীশ্বরবাদী, অনাত্মাবাদী এবং ভূতবাদী। এর আরেক নাম লোকায়ত মতবাদ। ভারতের প্রথম বস্তুবাদী চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছিল চার্বাক মতবাদে। এই দর্শনের আরও একটি নাম বস্তুবাদী দর্শন। বৈদিক সাহিত্যে যে ছয়টি শ্রেণীর নাস্তিকের কথা বলা হয়েছে তাদের মধ্যে চার্বাক একটি। অন্য ৫টি হল : মাধ্যমিক, যোগাচার, সৌত্রান্তিক, বৈভাষিক ও দিগম্বর।



প্রথমে প্রাচীন বস্তুবাদী মতবাদের নামটা নিয়ে একটু আলোচনা সেরে নেই। আগেই বলে রাখছি, আমি যে 'চার্বাক' শব্দটি লিখছি সেটা বাংলাতে এবং এর বাংলা উচ্চারণও 'চার্বাক'। কিন্তু সংস্কৃত ভাষায় এর উচ্চারণ হল 'চার্বাকা' (चार्वाक, Cārvāka) । অর্থাৎ এখানে চার্বাকের 'ক' এর নিচে কোন হসন্ত ব্যবহার হবে না।



এখন আলোচননায় আসি। 'চার্বাক' শব্দটি কোথা থেকে এলো? অনেক দার্শনিকের মতে 'চারু+বাক্‌' থেকে চার্বাক কথাটি এসেছে। তাদের মতে, মানুষের স্বাভাবিক ভোগ প্রবৃত্তির কথা যে মতবাদে 'চারু' বা সুন্দরভাবে বলে, তাই চার্বাক। চার্বাক মতে, ইহ জগতেই সব কিছুর শেষ। মৃত্যুর পরে অন্য জগত বলে কিছু নেই। অতএব ভোগ কর।


অন্য মতে 'চর্ব' (অর্থাৎ চর্বন) করে যে- এই অর্থে চার্বাক শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এই ধরণের ব্যখ্যায় তারা বলতে চান -চর্ব-চোষ্য খানা-পিনার মধ্যেই জীবনের চরমতম স্বার্থকতা যে মতবাদ খুঁজে পায়, তারই নাম চার্বাক দর্শন।


ব্যাকরণ মানতে গেলে দুট মতকেই বাতিল করতে হয়। 'চারু+বাক্‌' থেকে 'চারুবাক্‌' অথবা 'চার্‌বাক্‌' বা 'চার্বাক্‌' ( চার্বাক বা চার্বাকা নয়)। আবার 'চর্বন করে যে' সে চার্বক (চার্বাক বা চার্বাকা নয়)।



পালি সাহিত্য বিষয়ে সুপণ্ডিত রিস দেভিডস (Rhys Davids) - এর মতে মহাভারতের এক কুচরিত্র রাক্ষস চার্বাক-এর নাম থেকেই ভাববাদীরা বস্তুবাদী মতবাদটির নাম রাখেন চার্বাক দর্শন। মহাভারতে আছে- চার্বাক ছিল দুর্যোধনের বন্ধু আর এক দুরাত্মা। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ-বিজয়ী ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে ব্রাহ্মণ ছদ্মবেশধারী চার্বাক জ্ঞাতিঘাতী হিসেবে ধিক্ষার জানিয়ে আত্মঘাতী হতে প্ররোচিত করেছিল। কিন্তু উপস্থিত ব্রাহ্মণগণ তাদের অতীন্দ্রিয় ক্ষমতায় চার্বাক-এর আসল পরিচয় জেনে ফেলে যুধিষ্ঠিরকে রক্ষা করেন। পাঠকগণ, বুঝতেই পারছেন, প্রাচীন ভাববাদীরা বস্তুবাদী মতবাদটির প্রতি মানুষের অশ্রদ্ধা ও ঘৃণা সৃষ্টির জন্যই এমন এক ঘৃণ্য রাক্ষস চরিত্রের নামে মতবাদটির নাম রেখেছিলেন।

সে'যুগের কিছু ভাববাদী চার্বাক বা লোকায়ত মতবাদকে দেবগুরু বৃহস্পতি প্রণীত বলে উল্লেখ করেছেন। পুরাণে আছে- অসুরদের পরাক্রমে বিধ্বস্ত দেবকুলকে রক্ষা করতে এক কৌশল অবলম্বন করেছিলেন দেবগুরু বৃহস্পতি। অসুরদের ধ্বংসের জন্য, অধঃপাতে নিয়ে যাবার জন্য এই ভ্রান্ত মতবাদ রচনা করলেন। তারপর অসুরের ছদ্মবেশে অসুরদের মধ্যে বস্তুবাদী দর্শনটি প্রচার করলেন। ফলে নীতিভ্রষ্ট, ভ্রান্ত অসুররা দেবতাদের কাছে পরাজিত হল। এখানেও আমরা দেখতে পাচ্ছি- বস্তুবাদী চার্বাক মতবাদই অসুরদের ধ্বংসের কারণ হয়েছিল- এই রকম প্রচারের মধ্য দিয়ে বস্তুবাদী দর্শনের প্রতি আতঙ্ক এবং বিদ্বেষ সৃষ্টির চেষ্টা স্পষ্ট।

শঙ্করাচার্য প্রমুখ ভাববাদী দার্শনিকেরা এই মতবাদকে 'লোকায়ত' নামে অবহিত করার কারণ হিসেবে জানিয়েছেন- দর্শনটি ইতর লোকের দর্শন, তাই 'লোকায়ত' দর্শন। এখানে দার্শনিকদের লোকায়ত মতবাদের প্রতি অশ্রদ্ধা স্পষ্ট।



সাধারণ মানুষের মধ্যে যুক্তিবাদী চিন্তার বিরুদ্ধে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে 'রামায়ণ', 'মহাভারত'- এর মত মহাকাব্যগুলোতে ঢুকে পড়েছে অনেক কাহিনী, অনেক নীতকথা। রামায়নের অযোদ্ধা-কাণ্ডের দিকে তাকান। রামচন্দ্র তখন চিত্রকূটে। ভরত এলেন। রামচন্দ্র ভরতকে রাজ্য-পরিচালন বিষয়ে উপদেশ দিতে গিয়ে বললেন,


ক্কচিন্ন লোকায়তিকান্‌ ব্রাহ্মণাংস্তাত সেবসে।

অনর্থকুশলা হ্যেতে বালাঃ পণ্ডিতমানিনঃ।।


অর্থাৎ, '' আশা করি তুমি লোকায়তিক ব্রাহ্মণদের সেবা করছ না। ওরা অনর্থ ঘটাতে খুবই পটু। "



মহাভারতের শান্তিপর্ব। এক ধনী বণিক অথে যাবার সময় এক ব্রাহ্মণকে ধাক্কা মারে। ক্ষুব্ধ ব্রাহ্মণ অপমানের জ্বালা ভুলতে আত্মহত্যা কথা চিন্তা করে। দেবরাজ ইন্দ্র ব্রাহ্মণের আত্মহত্যার মধ্যে সর্বনাশের সংকেত দেখতে পেয়ে শিয়াল সেজে হাজির হলেন। ব্রাহ্মণকে পশুজীবনের বহু কষ্টের কথা বলে মানবজীবনের জয়গান গাইলেন। জানালেন, অনেক জন্মের পর পুণ্যের ফল সঞ্চয় করে এই মানবজন্ম পাওয়া। এমন মহার্ঘতম মানবজীবন, বিশেষত শ্রেষ্ঠ মানুশ হিসেবে ব্রাহ্মণ হয়েই জন্মলাভের পরেও কেউ কি পারে সে-জীবন ধ্বংস করতে? অভিমানে আত্মহত্যা করা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। শিয়াল, সে নিজেও আগের জন্মে ব্রাহ্মণ কয়েই জন্মেছিল। কিন্তু সে জন্মে চূড়ান্ত মূর্খের মত এক মহাপাতকের কাজ করেছিল বলেই আজ এই শিয়ালের জন্ম।


চূড়ান্ত মূর্খের মত কাজটা কী? এ-বারেই বেরিয়ে এল নিতিকথা -

অহমাংস পণ্ডিতকো হৈতুকো দেবনিন্দকঃ।

আন্বীক্ষিকীং তর্কবিদ্যম্‌ অনুরক্তো নিরার্থিকাম।।

হেতুবাদান্‌ প্রবদিতা বক্তা সুংসৎসু হেতুমৎ।

আক্রোষ্টা চ অভিবক্তা চ ব্রাহ্মবাক্যেষু চ স্বিজান্‌।।

নাস্তিকঃ সর্বশঙ্কী চ মূর্খঃ পণ্ডিতমানিকঃ।

ভাস্য ইয়ং ফলনিবৃত্তিঃ শৃগালত্বং মম দ্বিজ।।

(শান্তিপর্ব- ১৮০/৪৭-৪৯)


অর্থাৎ, আমি ছিলাম এক বেদ-সমালোচক তার্কিক পণ্ডিত। নিরর্থক তর্কবিদ্যায় ছিলাম অনুরক্ত। বিচারসভায় ছিলাম তর্কবিদ্যার প্রবক্তা। যুক্তিবলে দ্বিজদের ব্রহ্মবিদ্যার বিরুদ্ধে আক্রোশ মেটাতাম। ছিলাম জিজ্ঞাসু মনের নাস্তিক। অর্থাৎ কিনা পাণ্ডিত্যভিমানী মূর্খ। হে ব্রাহ্মণ, তারই ফলস্বরূপ আমার এই শিয়ালজন্মও।



পাঠক-পাঠিকা গণ, আশা করি আপনাদের মাথায় নিশ্চই এখন উঁকি-ঝুঁকি দিচ্ছে, চার্বাক বা লোকায়ত মতবাদে কি এমন কথা বলা হয়েছে, যা অবহেলায় পাশে সরিয়ে দেয়ার সাধ্য সে যুগের রথী-মহারথী দার্শনিকদের ছিল না (যদিও প্রক্ক্রিত অর্থে তারা কেউই 'দার্শনিক' ছিলেন না।) যার ফলে ভাববাদী রথী-মহারথীরা বস্তুবাদী এই মতবাদকে লক্ষ্য করে তীক্ষ্ণ আক্তমণ করেছেন? সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষদের দর্শনটি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে নানাভাবে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন?




ভারতবর্ষে আধ্যাত্মবাদী বা ভাববাদী সর্শনের সুস্পষ্ট প্রকাশ দেখতে পাই আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে 'উপনিষদ' সাহিত্যে। চার্বাক বা লোকায়ত দর্শন বা বস্তুবাদী যুক্তিবাদের সূচনা সঠিক কবে হয়েছিল বলা সম্ভব নয়। তবে আনুমানিক অষ্টম শতকে রচিত বৌদ্ধ দার্শনিক কমলশীলের ব্যাখ্যা-গ্রন্থ 'পঞ্জিকা'তে বস্তুবাদী চার্বাক মতবাদের উল্লেখ রয়েছে দেখতে পাই।



কমলশীলের গুরু শান্তরক্ষিত নিজের মতের সমর্থনে 'তত্ত্বসংগ্রহ' নামে একটি দর্শনগ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচনায় দেখতে পাই বস্তুবাদী যুক্তি-তর্ক নির্ভর মতবাদকে তিনি 'চার্বাক' না বলে 'লোকায়ত' বলে বর্ণনা করেছিলেন।



শান্তরক্ষিত থেকে শঙ্করাচার্য পর্যন্ত বেশ কয়েকজন বিখ্যাত আধ্যাত্মবাদী বা ভাববাদী দার্শনিকের রচনায় 'লোকায়ত' বা 'চার্বাক' নামের যুক্তি-তর্ক নির্ভর মতবাদটির উল্লেখ আছে। সে সময় ভারতীয় দর্শনের প্রথামত পরমত খণ্ডণ করে নিজের মত স্থাপন করা হত। পরমত হিসেবেই এইসব ভাববাদী দার্শনিকেরা চার্বাক বা লোকায়ত মতবাদের বিভিন্ন মতের উল্লেখ করেছেন। আর সেই উল্লেখ থেকেই আমরা চার্বাক দর্শন বিষয়ে কিছু জানতে পারি। চার্বাক বা লোকায়ত দর্শন ছিল সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের দর্শন, যা ছড়া হিসেবে প্রচলিত ছিল মানুষের মুখে মুখে। অলিখিত এই ছড়াই লোকগাথার রূপ পেয়েছিল।



আত্মা অবিনশ্বর হলে তবেই মৃত্যুর পর আসে স্বর্গ নরক ভোগের প্রশ্ন, জন্মান্তর পূর্বজন্মের কর্মফল ইত্যাদি প্রশ্ন। আত্মা নশ্বর হলে এইসব প্রশ্নই অর্থহীন হয়ে যায়।

চার্বাক বা লোকায়ত-দর্শনে আত্মার বিষয়ে এমন কিছু যুক্তির অবতারণা করা হয়েছিল যেগুলো ইতরজন বা সাধারণের কাছেও গ্রহণীয় হয়ে উঠেছিল।

চার্বাক দর্শনে আত্মা বা চৈতন্যকে দেহধর্ম বলে বর্ণনা করা হয়েছে। আর এই বক্তব্যই ভাববাদী দার্শনিকের কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বস্তুবাদী চার্বাক দর্শনের সঙ্গে ভাববাদী দর্শনের। সুদীর্ঘ লড়াই চলেছিল শুধুমাত্র আত্মা 'অমর' কি 'মরণশীল' এই নিয়ে।



লোকায়ত দর্শন মতে- কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য প্রমাণের প্রয়োজন। বিশ্বাস-নির্ভর অনুমানের সাহাহ্যে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। অনুমান-নির্ভর, একান্ত বিশ্বাস-নির্ভর অমর আত্মা, ইহলোক, পরলোক ইত্যাদি ধারণাগুলো লোক ঠকানোর জন্য একদল ধূর্ত লোকের সৃষ্টি।



প্রমাণের জন্য প্রত্যক্ষ প্রমাণই শ্রেষ্ঠ বলে চার্বাক দর্শন মনে করলেও প্রত্যক্ষ অনুগামী জ্ঞানকেও মর্যাদা দিয়েছিল। অপ্রত্যক্ষ প্রমাণের ক্ষেত্রে প্রতিটি অনুমানের মূল শর্ত অবশয়ই হবে 'পূর্ব প্রত্যক্ষ' অর্থাৎ প্রত্যক্ষের ওপর নির্ভর করে অনুমান। যেমন ধোঁইয়া দেখলে আগুনের অনুমান, গর্ভ দেখলে অতীত মৈথুনের অনুমান ইত্যাদি।



ভাববাদীদের চোখে প্রত্যক্ষ ও প্রত্যক্ষ-অনুগামী জ্ঞানের গুরুত্ব ছিল সামান্য অথবা অবান্তর। তারা অনেক বেশি গুরুত্ব দিতেন, 'ঋষি' নামধারী ধর্মগুরুদের মুখের কথাকে, ধর্মগুরুদের অন্ধ-বিশ্বাসকে যার উপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছিল আত্মা সংক্রান্ত মতবাদ বা আধ্যাত্মবিদ্যা।



আজও যারা বলেন, "বিজ্ঞানের সঙ্গে ধর্ম এবং আধ্যাত্মবাদের কোন দ্বন্দ্ব নেই, বরং আধ্যাত্মতত্বই 'পরম বিজ্ঞান', তারা এটা ভুলে যান- প্রত্যক্ষ জ্ঞান বা অপ্রত্যক্ষ প্রমাণ ছাড়া প্রকৃত বিজ্ঞানের প্রথম ধাপটিতে পা রাখাই সম্ভব নয়। আর আধ্যাত্মতত্ব দাঁড়িয়ে আছে 'আত্মা অমর' এই বিশ্বাসের উপর, যা বিজ্ঞান-বিরোধী বিশ্বাস।



লোকায়ত দর্শন প্রত্যক্ষ ও প্রত্যক্ষ অনুগামী জ্ঞানের উপর নির্ভর করে দ্বিধাহীন ভাষায় ঘোষণা করেছিল- চৈতন্য দেহেরই গুণ বা দেহেরই ধর্ম। দেহ ধ্বংস হওয়ার পর চৈতন্যস্বরূপ আত্মার অস্তিত্ব অজ্ঞান ও ধূর্তদের কল্পনা মাত্র। আর 'আধ্যাত্মতত্ত্ব' বা আত্মার অবিনশ্বরতার উপর নির্ভর করে ওঠা তত্ত্ব বিজ্ঞানের লক্ষণ নয় ; অজ্ঞানের লক্ষণ।



লোকায়ত দর্শনের এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে শংকরাচার্য যে যুক্তি দিয়েছিলেন তা হল- লোকায়তদের মতে দেহের মূল উপাদান জল, মাটি, আগুন, বায়ু ইত্যাদি ভূত-পদার্থ। এই প্রতিটি পদার্থই জড় বা অচেতন পদার্থ। তাহলে এই অচেতন পদার্থে গড়া মানুষের মধ্যে চেতনা আসছে কোথা থেকে? আসছে নিশ্চই এই সব অচেতন পদার্থের বাইরে থেকেই। অতএব স্বীকার করে নেয়া উচিৎ- চৈতন্য বা আত্মা দেহের অতিরিক্ত একটা কিছু। আত্মা বিষয়ে অন্যান্য বহু আধ্যাত্মবাদী দার্শনিক যে সব তর্কের ঝড় তুলেছেন, তাঁদের অনেকের বক্তব্যেই শংকরাচার্যের এই যুক্তির সুর লক্ষ্য করা যায়। তাঁরাও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন- জড় বা অচেতন পদার্থে গড়া দেহ তো সরল যুক্তিতে অচেতনই হবার কথা। তবে মানুষের চৈতন্য আসছে কোথা থেকে?



লোকায়ত দর্শন এই যুক্তির বিরুদ্ধে পালটা যুক্তিও হাজির করেছে - মদ তৈরির উপকরণগুলোতে আলাদা করে কোন মদশক্তি নেই। কিন্তু সেই উপকরণগুলোকেই এক ধরণের বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মিলন ঘটানোর পর সম্পূর্ণ নতুন এক গুণ পাওয়া যাচ্ছে, যাকে বলছি মদ। আত্মা বা চৈতন্যও একই জাতীয় ঘটনা।

লোকায়তিকদের চৈতন্যএর সঙ্গে মদশক্তির তুলনা নিয়ে কোন বিপক্ষ দার্শনিকই কুটতর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেননি। তবে, দৃষ্টান্ত হিসেবে এনেছেন মৃতদেহের তুলনা। চৈতন্য যদি দেহেরই লক্ষণ বা ধর্ম হয়, তবে মৃতদেহেও তো চৈতন্য থাকার কথা, থাকেনা কেন?



লোকায়ত দর্শনের আত্মা বা চৈতন্যতত্ত্বের কাছে এটাই সবচেয়ে জোরালতম যুক্তি। চার্বাক বা লোকায়ত দর্শন এর বিপক্ষে জোরাল কোন যুক্তি আর হাজির করতে পারেনি। প্রাচীনকালের পটভূমিতে শারিরবিদ্যার অনগ্রসরতার যুগে এই ধরনের যুক্তির কোন উত্তর দেয়া সম্ভব ছিল না। আজ বিজ্ঞানের তথা শারীর-বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আমরা অনেক কিছুই জেনেছি, তারই ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি দেহ ও মৃতদেহের ধর্ম সমান নয়। চিন্তা, চেতনা বা চৈতন্য মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের ক্রিয়া।



মৃতদেহের ক্ষেত্রে মৃতদেহেরই অংশ মস্তিষ্ক স্নায়ুকোষের যেহেতু মৃত্যু ঘটে তাই স্নায়ুকোষের ক্রিয়াও ঘটে না, ফলে মৃতদেহের ক্ষেত্রে চৈতন্য বা চিন্তা থাকে অনুপস্থিত।

লোকায়ত দর্শনে আত্মা, পরলোক এবং পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম নিয়ে এমন অনেক যুক্তি দেখান হয়েছে, যেসব যুক্তি এযুগের যুক্তিবাদীদেরও ঈর্ষা জাগাবার মত। ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি এর সম্পাদক প্রবীর ঘোষ চার্বাক দর্শনের কিছু শ্লোকের কাব্যানুবাদ করেছেন। কিছু উদাহরণ দেয়া হল :



১. ব্রাহ্মণ জীবিকা হেতু তৈরি শ্রাদ্ধাদি বিহিত।

এছাড়া কিছুই নয় জেনো গো নিশ্চিত।।


- ব্রাহ্মণেরা তাদের জীবিকার তাগিদেই 'শ্রাদ্ধ' নামক নিয়ম চালু করেছে। পয়সা কামানোর অজুহাত ছাড়া শ্রাদ্ধ আর কিছুই নয়।



২. যদি, শ্রাদ্ধকর্ম হয় মৃতের তৃপ্তির কারণ।

তবে, নেভা প্রদীপে দিলে তেল উচিৎ জ্বলন।।


- শ্রাদ্ধকর্মের ফলে যদি মৃতের তৃপ্তি হয় তাহলে নেভা প্রদীপে তেল দিলেও আগুন জ্বলা উচিৎ।



৩. পৃথিবি ছেড়ে যে ভূতপদার্থে ফেরে তার পাথেও দিতে পিণ্ডদান বৃথা।

যেমন, ঘর যে গ্রামান্তরে তার পাথেও ঘরে দেয়া বৃথা।।


- বিদেশে থাকা পরিবারের সদস্যের জন্য দেশে বসে রান্না করা বৃথা, ঠিক তেমনি মৃতের উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান করাও বৃথা।



৪. চৈতন্যরূপ আত্মার পাকযন্ত্র কোথা?

তবে তো পিণ্ডদান নেহাতই বৃথা।।


- আত্মার কি পাকস্থলী আছে? যদি না থাকে তাহলে তার উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান করলে সে খাবে পিণ্ড বা মাংস খাবেই বা কিভাবে আবার হজম করবেই বা কিভাবে?



৫. যদি জ্যোতিষ্টোম যজ্ঞে বলি দিলে পশু যায় স্বর্গে।

তবে, পিতাকে পাঠাতে স্বর্গে ধরে-বেধে বলি দাও যজ্ঞে।।


- জ্যোতিষ্টোম যজ্ঞে পশুবলি দিলে যদি পশু স্বর্গেই গিয়ে থাকে, তাহলে পিতাকে স্বর্গে পাঠানোর জন্য তাকে ধরে-বেধে যজ্ঞে বলি দিলেই তো হয়, শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের দরকার কী?




৬. ভণ্ডরা পশুর মাংস খেতে অজুহাত চান।

তাই তারা দিয়েছেন বলির বিধান।।


- ব্রাহ্মণেরা পশুহত্যা মহাপাপ বলেছিলেন। তারা হিন্দুদের নিরামিষ ভোজনের বিধান দিয়েছিলেন। কিন্তু নিজেরা মাংস খাওয়ার লোভ সামলাতে পারেন নি। তাই ব্রাহ্মণদের আমিষ খাওয়া নিশিদ্ধ হলেও যজ্ঞে উৎসর্গকৃত পশুর মাংস তারা খেতেই পারতেন। তাই তারা যজ্ঞে পশুবলির বিধান দেন।




বুদ্ধের পর চার্বাক দর্শনের বিকাশের কোন খবর আমরা পাইনি।তার কারণ হতে পারে,

১. বৌদ্ধ দর্শন চার্বাক দর্শন অপেক্ষা অনেক উন্নততর, সংঘবদ্ধ, সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য দর্শন ছিল।

২.বৌদ্ধ দর্শনের আবির্ভাব ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বৌদ্ধ অনুরাগিদের অগ্রগমন, পিছিয়ে থাকা চার্বাক দর্শনকে আরো পিছিয়ে দিয়েছিল।

৩. চার্বাক দর্শনের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের মগজ ধোলাই।



ফলে আমরা দেখতে পেলাম, যে শোষিত সাধারণ মানুষদের উপকারের জন্য চার্বাক দর্শন আত্মাবাদ ও ঈশ্বরবাদকে শানিত যুক্তিতে খণ্ডন করেছিল, সেই শোষিত সাধারণ মানুষই একসময় চার্বাক দর্শনকে এক নীতিহীন দর্শন বলে দূরে ঠেলে দিয়েছিল। এমনকি 'চার্বাক' শব্দটিকে লোকে গালাগাল বলেই ভাবতে শুরু করেছিল।



উপাসনা-ধর্মে বিশ্বাসীরা (উপাসনা ধর্ম বলতে ইংরেজি 'religion' শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দকে বোঝাতে চাইছি। শুধু 'ধর্ম' শব্দটির দ্বারা ইংরেজি 'property' শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ বোঝায়) চার্বাকদের আরো নানা নামে চিহ্নিত করেছিল- লোকায়ত, বৃহস্পত্য, স্বাভাবিক, ভূতবাদী ইত্যাদি। চার্বাকেরা মনে করতেন, জগৎ স্বভাবগতভাবেই বৈচিত্র্যময় ও বৈচিত্র্যের কারণ। অতএব ঈশ্বরকে বৈচিত্র্যের স্রষ্টা ভাবাটা ভূল। ভূতবাদী হিসেবে ওরা মনে করতেন- ক্ষিতি বা পৃথিবী, অপ বা জল, তেজ বা আগুন ও মরুৎ বা বায়ু থেকেই সব কিছুর সৃষ্টি। ধ্বংসে সবই আবার এই চার ভূতেই বিলীন হয়।



'ভূতবাদ' মনে করত, পৃথিবীতে পদার্থেও পরিমাণ পাঁচ। আবার কিছু ভূতবাদীদের মতে পৃথিবীতে মৌলিক পদার্থের পরিমাণ চার। এই মৌলিক পদার্থ থেকেই পৃথিবীর বস্তু ও প্রাণীর সৃষ্টি। ধ্বংসে আবার সবই পঞ্চভূতে বা চার ভূতে বিলীন হয়। এই মৌলগুলো কী কী তা আমরা আগেই জেনেছি। এখন আমরা এই চারটি বা পাঁচটি মৌলিক পদার্থের তত্ত্ব মেনে নিতে পারব না। তাদের বর্ণিত মৌলিক পদার্থগুলোর মধ্যে একটিও প্রকৃত অর্থে মৌলিক পদার্থ নয়। আজ আমরা জানি এই পর্যন্ত আবিষ্কৃত মৌলিক পদার্থের সংখ্যা ১১১টি। কিন্তু পাঠক পাঠিকাগণ আপনারা এই তত্ত্ব কোন যুগের সেটা একটু বিবেচনায় আনুন। একটু বিবেচনা করলে স্বীকার করে নিতেই হয়, আজ থেকে দু'আড়াই হাজার বছর আগের কিছু চিন্তাবিদ কী অসাধারণ বিপ্লবাত্মক চিন্তায় পৌঁছেছিলেন- সব কিছুই মৌলিক পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত এবং মৃত্যুর পর মৃতদেহ মৌলিক পদার্থে বিলীন হয়ে যায়। দেহাতীত আত্মা বলে কিছু নেই। এমন চিন্তা মানুষের মাথায় এসেছিল সম্ভবত মৃত্যুর পর দেহের পরিণতি দেখে, অস্ত্র ও তৈজস্পত্রের ভঙ্গুরতা দেখে। মৃতদেহকে পচে-গলে মাটিতে মিশে যেতে দেখে, পূড়ে ছাই হয়ে শেষ হয়ে যেতে দেখে। অনুমান করে বলা যেতে পারে, তাদের এসব প্রত্যক্ষ প্রমাণ চতুর্ভূত বা পঞ্চভূত তত্ত্বে পৌঁছে দিয়েছিল।



সে সময়ের প্রেক্ষিতে চতুর্ভূত বা পঞ্চভূত তত্ত্বকে অবশ্যই অসাধারণ বলতেই হয়। দুঃখ এই, আজকের যুগে যেখানে মৌলিক পদার্থ নিয়ে বিজ্ঞানের গবেষণা যখন বিশাল রকম এগিয়ে গেছে, শারীরবিদ্যা নিয়ে গবেষণাও যখন অনেক দূরে এগিয়ে গেছে, সেখানে কিছু মানুষ আজও বিশ্বাস করে, মৃত্যুর পর দেহ মাটিতে পুঁতে ফেললেও, আগুনে পুড়িয়ে দেবার পরও সব শেষ হয় না, বেঁচে থাকে আত্মা, অর্থাৎ চিন্তা, চেতনা, চৈতন্য বা মন। আড়াই হাজার বছরে বিজ্ঞান অনেক এগোলো, কিন্তু আমাদের চেতনা এগোলো কই? আমরা তো যুক্তিহীনতার আবর্তে তলিয়ে যাচ্ছি। এই অধঃপাতকেই কি আমরা মেনে নেব?

বিবেকানন্দ প্রসঙ্গে

স্বামী বিবেকানন্দের অনেক সুন্দর সুন্দর বাণী আছে। যেমনঃ
১. জীবে প্রেম করে যেই জন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।
২. হে ভারত ভুলিও না মেথর মুচি চণ্ডাল তোমার ভাই...
৩. খালি পেটে ধর্ম হয় না...
৪. ভারত বেরুক চাষার কুটির ভেদ করে......

এমনই আরও অনেক হাজার বাণী হাজির করা যায়, যেগুলো সত্যিই শুনতে ভাল লাগে। বিবেকানন্দকে খণ্ডিতভাবে না জেনে সামগ্রিকভাবে জানতে তাঁর 'বাণী ও রচনা', 'পত্রাবলী', নিবেদিতার লেখা 'স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়াছি', শঙ্করীপ্রসাদ বসুর লেখা 'বিবেকানন্দ ও সমকালীন ভারতবর্ষ' নামক বইগুলো পড়াটা জরুরি। এসব পড়লে বিবেকানন্দ সম্পর্কে যে ধারণা পরিষ্কার হয়ে ওঠে তা ভয়ংকর! সোজা-সাপটা স্ববিরোধীতা।

বিবেকানন্দ এক দিকে বাণী দিচ্ছেন "জীবে প্রেম করে যেই জন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর" পাশাপাশি কলকাতার বরানগরের মাঠে পশুবলির প্রবর্তন করেন।

দরিদ্র সেবার খেত্রেও ছিলেন পাকা হিসেবি। ১৮৯৭ সালে বিবেকানন্দ একটি চিঠি দিয়ে স্বামী ব্রহ্মানন্দকে নির্দেশ দেন, "কলকাতার মিটিং-এর খরচা বাদ দিয়ে যা বাঁচে ঐ famine-এতে (দুর্ভিক্ষে) পাঠাও বা কলকাতা, ডোমপাড়া, হাড়িপাড়া বা গলিঘুঁজিতে অনেক গরীব আছে তাদের সাহাহ্য কর... তারপর লোকের (হিন্দুত্বে) বিশ্বাস হবে, তারপর যা বলবে শুনবে।" (পত্রাবলি, পত্র নম্বর ৩৬৩)

বিবেকানন্দ একদিকে বলেছেন, " হে ভারত ভুলিও না মেথর মুচি চণ্ডাল তোমার ভাই...", বলেছেন, "ভারত বেরুক চাষার কুটির ভেদ করে...", তখন তিনিই চিঠি লিখে শিষ্যদের নির্দেশ পাঠাচ্ছেন, " ধনী দরিদ্রের বিবাদ যেন বাঁধিয়ে বসো না। ধনীদের আদতে গালমন্দ দেবে না।" (পত্রাবলী, পত্র নম্বর ৪৭৬)

'ব্রহ্ম-বাদিন্‌' পত্রিকার পরবর্তী সংখ্যাগুলোতে কী করা উচিৎ, সে বিষয়ে উপদেশ দিয়ে তাঁর একটি চিঠি, " গত সংখ্যায় ক্ষত্রিয়দের খুব বাড়ান হয়েছে, পরের সংখ্যায় ব্রাহ্মণদের খুব প্রশংসা কর, তারপরের সংখ্যায় বৈশ্যদের।" (পত্রাবলী, পত্র নম্বর ২৩৯)

বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে বিদ্যাসাগর ও রামমোহনের মতামত জানি। বিবেকানন্দ এই প্রসঙ্গে বলেছেন, " বাল্যবিবাহের উপর আমার প্রবল ঘৃণা।" (ভারতীয় নারী, প্রকাশক উদ্বোধন কার্যালয়, পৃষ্ঠা ৯০)। তারপরই আমরা ভয়ংকর রকমের ধাক্কা খাই, যখন দেখি "ভারতীয় নারী' বইটির ১৫ পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দের একটি মত মুদ্রিত রয়েছে, যেখানে তিনি বলেছেন, "কখনো কখনো শিশু বয়সেই আমাদিগকে বিবাহ দেওয়া হয়, কেন না বর্ণের নির্দেশ। মতামতের অপেক্ষা না রাখিয়া যদি বিবাহের ব্যবস্থা করিতে হয়, তবে প্রণয়বৃত্তি জাগ্রত হওয়ার পূর্বে বিবাহ বাল্যকালে বিবাহ দেওয়া ভাল।"

প্রণয়বৃত্তি বা প্রেম সম্বন্ধে বিবেকানন্দের মতামতে চোখ রাখি আসুন। তিনি বলেছেন, "যদি কাউকে ইচ্ছেমতো পতি বা পত্নীরূপে গ্রহণের স্বাধীনতা দেওয়া যায়, যদি ব্যক্তিগত সুখ এবং পাশবপ্রবৃত্তির পরিতৃপ্তির চেষ্টা সমাজে বিস্তার লাভ করে, তার ফল নিষচয় অশুভ হবে- দুষ্টপ্রকৃতি, অসুর ভাবের সন্তান জন্মাবে।" (বিবেকানন্দ ও সমকালীন ভারতবর্ষ, ৩য় খণ্ড, শঙ্করীপ্রসাদ বসু, পৃষ্ঠা ২৬৪)।

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে নিবেদিতপ্রাণ অনেক দেশপ্রেমীর কাছে বিবেকানন্দ ছিলেন আদর্শ। ১৮৯৭-এর ২৬ ফেব্রুয়ারি কল্কাতা-অভিনন্দনের উত্তর দিতে গিয়ে বিবেকানন্দ আবেগের সঙ্গে বলেছিলেন, "ইংরাজদের সম্বন্ধে যে ঘৃণার হৃদয় নিয়ে আমি ইংলণ্ডের মাটিতে পদার্পন করেছিলাম, কোন জাতি সম্বন্ধে তার থেকে অধিক ঘৃনার ভাব নয়ে সে দেশের মাটিতে আর কেউ কখনো নামেনি।" বিবেকানন্দের এই বক্তব্যকে অনেকেই তুলে ধরে প্রমাণ করতে চান তার ইংরেজ-বিদ্বেষ। কিন্তু আসলে এটা বিবেকানন্দের বক্তব্যের অংশ বিশেষ। "কেউ কখনো নামেনি"-র পরের লাইনেই বিবেকানন্দ বলেছিলেন, " এই সভামঞ্চে যেসব ইংরেজ বন্ধু উপস্থিত আছেন, তারাই সে বিষয়ে সাক্ষ্য দেবেন। কিন্তু যতই আমি তাদের মধ্যে বাস করতে লাগলাম, তাদের জাতীয় জীবনযন্ত্র কিভাবে কাজ করছে দেখতে পেলাম, তাদের সঙ্গে মিশে জানলাম কোথায় রয়েছে তাদের জাতির হৃৎস্পন্দন - ততই আমি তাদের ভালবাসতে লাগলাম। তার ফলে, হে ভাতৃগন, এখানে এমন কেউ নেই যিনি আমার থেকে ইংরাজদের বেশি ভালবাসেন।" (বিবেকানন্দ ও সমকালীন ভারতবর্ষ, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২)। বিবেকানন্দের 'বাণি ও রচনা' ৯ম খণ্ডের ২৫৩ পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলেছেন,"সকল কথার ধুয়ো হচ্ছে - 'ইংরেজ আমাদের দাও।' বাপু আর কত দেবে? রেল দিয়েছে, তারের খবর দিয়েছে, রাজ্যে শৃংখলা দিয়েছে, ডাকাতদের তাড়িয়েছে, বিজ্ঞান শিক্ষা দিয়েছে। আবার কী দেবে? নিঃস্বার্থভাবে কে কী দেয়? বলি তোরা কী দিয়েছিস?"
বিবেকানন্দের এই সব বক্তব্য তুলে বলতে চাইছি, বিবেকানন্দকে পুরোপুরি ইংরেজ বিদ্বেষী বলে বর্তমানে যেভাবে চিত্রিত করা হয়, সেটা ঠিকা নয়। তিনি তাঁর স্বভাব বৈশিষ্ট্য অনুসারে কখনো ইংরাজ-প্রেম, কখনো ইংরেজ-বিদ্বেষ প্রকাশ করেছেন।

বিবেকানন্দের কিছু ভাল বাণী পড়ে খণ্ডিত বিবেকানন্দকে না জেনে সম্পূর্ণ বিবেকানন্দকে জানতে আন্তরিকতার সঙ্গে বইপত্র আদ্যন্ত পড়ুন। দেখতে পাবেন, বিবেকানন্দের সতীদাহের প্রতি সমর্থন থেকে বিধবা বিবাহ বিরোধিতার সম্পূর্ণ চিত্র। দেখতে পাবেন বিবেকানন্দের স্ববিরোধিতার নানা দিক। সুতরাং তাঁর প্রগতিশীল বাণিগুলোই শেষ কথা নয়।

বিদ্যাসাগর, রামমোহন শিক্ষা প্রসারে সমাজ সংস্কারে ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। শিক্ষা বিষয়ে বিবেকানন্দের মত ছিল একটু ভিন্ন রকম। তার কথায়, " এইসব বই, এইসব বিজ্ঞান আমাদিগকে কিছুই শিখাইতে পারিবে না। বই পড়িয়া আমরা তোতাপাখি হই, বই পড়িয়া কেহ পণ্ডিত হয় না। ... বই যত কম পড়েন ততই ভাল। ... গ্রন্থ দ্বারা জগতের ভাল অপেক্ষা মন্দ অধিক হইয়াছে।" (বাণী ও রচনা, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৫,৯৯ এবং ১০৯) সমাজ সংস্কার সম্বন্ধে বিবেকানন্দের স্পষ্ট অভিমত, "সমাজ সংস্কার ধর্মের কাজ নয়।" (পত্রাবলী, পত্র নম্বর ৮৩)

যে মতামত, আদর্শ ও আন্দোলনের জন্য বিদ্যাসাগর, রামমোহনকে আমরা শ্রদ্ধা করি, সেই মতামতের, আদর্শের বিরোধী চরিত্র'কে আমরা শ্রদ্ধা জানাবো কী করে? এতে আমাদের স্ববিরোধিতা, ভণ্ডামী, অজ্ঞতাই কি প্রকাশিত হয় না?

আমরা কী করবো, আমাদেরই ঠিক করতে হবে। আমজনতার আবেগে গা ভাসাবো, না-কি যুক্তি-বুদ্ধিকে শানিত করতে সচেষ্ট হবো? আবেগ হল যুক্তির সবচেয়ে বড় শত্রু। আবেগ চিন্তা শক্তিকে দুর্বল করে, যুক্তি দিয়ে বিচার করার ক্ষমতা শেষ করে দেয়। চিন্তা একটা অভ্যাস, একটা চর্চা। এই চর্চা ও শৃংখলাবদ্ধ যুক্তির মধ্য দিয়ে এগোলে সব সময়-ই আমরা উন্নত থেকে উন্নতত্তর মূল্যবোধে পৌঁছতে পারবো। বুঝে নিতে পারবোকোনটা ভালো, কোনটা খারাপ; কোনটা কালো, কোনটা সাদা। তারপরও একটা প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা কালোকে কালো, আর সাদাকে সাদা বলার হিম্মত দেখাবো কি না? একটা লাগাতার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ভীরুও সাহসী হয়ে ওঠে; সাহসী হয় ভীরু। মানষিকভাবে সাহসীদের সঙ্গে গভীর মেলামেশার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে ভীরুও সাহসী হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়াকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলে 'গ্রুপ থেরাপি'। আবার একজন শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী মানুষও জেলের প্রহার ও অন্ধকার সেলে থাকতে থাকতে একসময় সাধারণ আলো দেখলেও ভয় পেতে পারে। পাশা-পাশি এও সত্যি- একজন ব্যক্তির আদর্শ, সাহস বহুজঙ্কে উদ্দীপ্ত করে। আপ্নি-আমিও পারি সেই ব্যতিক্রমী মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে।

হ্যাঁ, আমাদেরই ঠিক করতে হবে,জনতার আবেগের সুরে সুর মেলাবার নিরাপদ পন্থা গ্রহন করবো, নাকি সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলার হিম্মত দেখাবো? আমরা কাকে শ্রদ্ধা জানাবো- যাঁদের কর্মময় জীবন-ই ছিল বাণী, না-কি বাণীদান-ই যাঁদের প্রধান কর্ম?

রবিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১১

বিজ্ঞান ও ঈশ্বরের মেলবন্ধনের প্রচেষ্টা

আধুনিক যুগে বিজ্ঞান আনেক দূর এগিয়ে গেছে । মৌলবাদীরা বুঝে গেছে যে এই বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে থেকে তাদের স্ব স্ব ধর্মকে টিকিয়ে রাখা আআর সম্ভব নয় । তাই তারা এখন তাদের ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের মিল খুঁজে এটাই প্রমাণ করতে চাইছে যে তাদের ধর্ম সত্য । এরকম কিছু উদাহরণ এখানে দেয়া হল :



বিজ্ঞান ও হিন্দু ধর্ম


একটি জনপ্রিয় হিন্দুধর্মীয় সংগঠন রামকৃষ্ণ মিশন এর লোকেরা তাদের বাংলা মুখপত্র ''উদ্বোধন'' এর একটি সংখ্যায় বিজ্ঞানের সাথে হিন্দু ধর্মের মিলকে ব্যাক্ষা করেছে এই ভাবে :


১. বিগ ব্যাং : বিজ্ঞানের এই ধারণার সঙ্গে তুলনা করা যায় শ্রীমদ্ভাগবতে কথিত সৃষ্টি বর্ণনা - "সকল পদার্থ ক্ষুভিত হইয়া পরস্পর মিলিত হইল । তাহার পর সেই সকল হইতে একটি অচেতন অণ্ড উৎপন্ন হইল । ... ঐ অণ্ড বহির্ভাগে ক্রমশ দশগুণ বর্ধিত প্রধাণাদি জলাদি দ্বারা পরিবৃত । সেই অণ্ডেই ভগবান হরির মূর্তিস্বরূপ লোকসমূহ বিস্তৃত আছে । আবার তিনি দশাঙ্গুলি পরিমিত হইলেও এই বিশ্ব আবৃত করিয়া আছেন । মায়ার অধীশ্বর সেই ভগবান বিবিধ রূপ ধারণ করিতে ইচ্ছা করিয়া আত্মমায়া দ্বারা যদৃচ্ছাক্রমে প্রাপ্তকাল, অদৃষ্ট ও প্রকৃতি আশ্রয় করিয়াছিলেন ।


২. ব্ল্যাক হোল : ব্ল্যাক হোল (কৃষ্ণ গহ্বর) জাতীয় মহাশূণ্যের তথাকথিত সিঙ্গুলারিটিতে (গাণিতিক ঊতসবিন্দু), যেখানে নতুন পদার্থ জন্ম নিচ্ছে, আধুনিক বিজ্ঞানে ভাবা হয় যে, সময় সেখানে স্তব্ধ হয়ে থাকে । সাধারণের মধ্যে বহুল প্রচলিত কথা ' ব্রহ্মার এক মুহূর্তে পৃথিবীর সহস্র বছর' এরই প্রতিধ্বনি ।


৩. নবজাতক শিশু (Test-Tube Baby), বিকল্প মা ( Surrogate Mother) : এইসব আধুনিক বিজ্ঞানের দান বলে আমরা মনে করলেও তা আসলে প্রাচীন হিন্দু সভ্যতার কাছে নতুন নয় । দ্রোণ ও দ্রোণীর জন্মকথা, সত্যবতীর জন্মকথা, এসব পুরাণের ঘটনা তারই প্রমাণ ।


৪. পেট্রিয়ট মিসাইল (Patriyot missile) : পেট্রিয়ট মিসাইল নামের বিধ্বংসী অস্ত্র ( উপসাগরীয় যুদ্ধে ব্যাবহৃত হয়েছিল ) আবিষ্কারের পর প্রমাণিত হয়ে গেছে 'বরুণ-বান' ও 'অগ্নি-বান' আদৌ কোন কল্পনা ছিল না ।


রামকৃষ্ণ মিশনের অমূল্য বাণীতে আরো আনেক কিছুই আছে যা বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় :

১. বিজ্ঞানের সব নবতর আবিষ্কারই বাস্তবে নতুন কোন আবিষ্কারই নয় । এ'সবই প্রাচীন যুগে হিন্দুরা আবিষ্কার করেছিল । প্রাচীন হিন্দু পুরাণে, মহাকাব্যে ( রামায়ণ, মহাভারত প্রভৃতি ) এই সব আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলোর উল্লেখ আমরা পাই ।

২. প্রাচীন হিন্দু পুরাণ, ধর্মশাস্ত্র, মহাকাব্যে আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলোর উল্লেখ রয়েছে রূপক আকারে । প্রয়োজন রূপকগুলোর ব্যাক্ষার । প্রয়োজন আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে রূপকথাগুলোর পুনর্ব্যাক্ষার ।

৩. হিন্দু ঋষিদের আধ্যাত্মবাদী জ্ঞান ও ঈস্বরবাদী জ্ঞান যা আসলে বিজ্ঞান, সেই বিজ্ঞান দ্বারা পাশ্চাত্যের অসম্পূর্ণ বিজ্ঞানকে অপসারণ করতে হবে । এবং এভাবেই আত্মবিসৃত জাতিকে ( হিন্দু জাতিকে বোঝানো হয়েছে) উঠে দাঁড়াতে হবে ।

৪. ঈশ্বরে বিশ্বাস ও যুক্তিমনস্কতা বা বিজ্ঞানমনস্কতার মধ্যে কোন বিরোধ নেই ।

৫. হিন্দু দর্শন অবশ্যই পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের চেয়ে অনেক বড় বিজ্ঞান । (যদিও সেটা প্রমাণ করার জন্য হিন্দু মোউলবাদীরা পাশ্চাত্য বিজ্ঞানকেই ব্যাবহার করছে...)



পশ্চিমবঙ্গের দেশ পত্রিকায় বিজ্ঞানের সাথে হিন্দুধর্মের মিল দেখানো হয়েছে আরেক ভাবে :
বেদান্তে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মডেল হিসেবে 'উর্ণনাভ' বা মাকড়সার উল্লেখ আছে । দেশ পত্রিকা বর্তমান বাস্তবিক মহাবিশ্বের সাথে মকড়সার মিল খুঁজে পেয়েছে । বিশ্বব্রাহ্মাণ্ড যেমন শূণ্য থেকে প্রসারিত হতে শুরু করে আবার সংকুচিত হয়ে শূণ্যে পরিণত হবে, থিক তেমনি মাকড়সা না হলেও মাকড়সার জালও প্রসারিত হয়ে এবং এটাকে গুটিয়ে নেয়া যায় । সুতরাং দেখুন বেদান্তে মহাবিশ্বার সাথে মাকড়সার কি অদ্ভুত এবং চমৎকার মিল খুঁজে পাওয়া গেল...




বিজ্ঞান ও ইসলাম ধর্ম



আনেক মুসলিম বিজ্ঞানী কোরানের সাথে বিজ্ঞানের মিল করতে চেয়েছেন । নিচে উদাহরণ দেয়া হল :

১. ফতেহ মোহাম্মদ : ইনি পাকিস্তানের একজন বিজ্ঞানী । কোয়ান্টাম মেকানিকস থেকে জিন সবই পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরানের আলোকে ব্যাক্ষা করা যায় এই প্রসঙ্গে তিনি একটি ঢাউস বই লেখেন । সরকার বইটির দারুন প্রশংসা করে । বইটিতে ব্যাক্ষা সহকারে দেখানো হয়েছে আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতিটি আবিষ্কারই নানা রূপকের আকারে রয়েছে কোরানে । তিনি নানা যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছেন ( আনেক মুসলিম এর মতে প্রমাণ করে সেরেছেন ) ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণ গহ্বর হল কোরানে বর্ণিত সোজখ বা নরক ।


২. পারভেজ আমিরালী হুদোভয় : ইনি পাকিস্তানের বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী । তিনি ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিজ্ঞান সম্মেলন-এ একটি গবেষণাপত্র পাঠ করেন । তাতে তিনি জানিয়েছেন :
(i) প্রতি সেকেণ্ডে আলোর যা গতি, তার চেয়েকম গতিবেগ হওার কারণে বেহেস্ত বা স্বর্গ আক্ষরিক অর্থেই বর্তমান অবস্থান থেকে সরে গেছে ।
(ii) শবেবরাতের পূণ্য রজনীর এক উপাসনা সাধারণ রাতের সহস্র উপাসনার চেয়ে শ্রেয় । ডঃ পারভেজ তার এই বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আপেক্ষিক তত্ত্বকে টেনে এনেছেন ।
(iii) কোরানে বর্ণিত সাত আসমান তত্ত্ব বিষয়ে তিনি বলেন, এগুলো পরমাণুর কোয়ান্টাম স্তরের মত । যেভাবে শক্তি শোষণ বা বর্জন করে পরমাণু স্তর পরিবর্তন করে, সেভাবে পাপ বা পূণ্য করেও এক আসমান থেকে অন্য আসমানে যাওয়া যায় ।


৩. ডঃ বি. এম. : ইনি পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তি কমিশনের উঁচু পদে অধিষ্ঠিত । তিনি তার এক প্রবন্ধে বলেছেন,
(i) কোরানে বর্ণিত অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন অগ্নিময় জীব আসলে জিনের অস্তিত্বের রূপকাকার ।
(ii) ব্ল্যাক হোলের অস্তিত্ব আধুনিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নতুন হলেও হাজার বছর আগে রচিত কোরানে এর উল্লেখ আছে ।কোরানে যে বেহেস্ত এর উল্লেখ আছে তা আসলে কৃষ্ণ গহ্বর । (লক্ষ্য করুন, বিজ্ঞানী ফতেহ মহাম্মদ কিন্তু এই ব্ল্যাক হোলকেই দোজখ বলেছেন )


৪. মোহাম্মদ মুনির : পাকিস্তানী লেখক মোহাম্মদ মুনির তার বই 'গড, ইউনিভার্স অ্যান্ড লাইফ' এ বলেছেন, ' আমাদের মনে রাখতে হবে, পারমাণবিক অবদানগুলো আধ্যাত্মিক । বস্তুবাদীরা আমাদের যেভাবে প্রোটন ও নিউট্রনে আকর্ষণের ক্ষেত্রে তড়িৎ চুম্বকীয় শক্তিকে বিশ্বাস করতে বলেন, আসলে তা কিন্তু সত্যি নয় । ভাবতে অবাক লাগে, যখন নর ও নারী একে অপরের পিছু ছুটছে, প্রেমে লিপ্ত হচ্ছে, তখন নর-নারীরাই এই বৈজ্ঞানিক সত্যটি উপলব্ধি করতে পারেন নি, যে প্রোটন ও নিউট্রন দুই লিঙ্গে বিভক্ত । ( বুঝুন ব্যাপারটা । পরমাণুর মধ্যে আত্মার আবিষ্কার এবং প্রোটন ও নিউট্রনে দুই বিপরীত লিঙ্গের আবিষ্কার ! মুনির সাহেব তাঁর এই যুগান্তকারী আবিষ্কারকে বিজ্ঞানের দরবারে পেশ করতে পারলে অবহেলে নোবেল জিততে পারতেন...)


৫. ডঃ রাশাদ খলিফা : মিশরের এই প্রখ্যাত বিজ্ঞানী অত্যাধুনিক কম্পিউটারের সাহাহ্যে লোরান বিশ্লেষণ করে, বিশ্লেষিত তথ্যের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, কোরান নিশ্চিতভাবেই আল্লাহর রচনা এবং কোরানই অলৌকিকের অস্তিত্বের প্রমাণ । ডঃ খলিফা এই বিশয়ে একটি বইও লিখে ফেলেছেন । সেটি হল ' দি কম্পিউটার স্পিকন গডস মেসেজ টু দি ওয়ার্ল্ড' । খলিফা সাহেব আবিষ্কৃত তথ্যের ভিত্তিতে মোঃ আব্দুর রাজ্জাক্লিখেছেন, 'আল-কোরান সর্বশ্রেষ্ঠ মজেযা এবং ঊনিশ' । 'মোজেযা' কথার অর্থ হল 'অলৌকিক ব্যাপার' । মোজেযা এবং ঊনিশশব্দ দু'টি নামকরণের সঙ্গে যুক্ত হবার সার্থকতা এই যে খলিফা সাহেব কম্পিউটারের সাহায্যে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন - ঊনিশ সংখ্যাটি পরম বিস্ময়কর ও চরম অলৌকিকত্বের চাঞ্চল্যকর তথ্যের বিস্তারিত নির্ভূল বর্ণনা ।